আজ ছাব্বিশে মার্চ। কলেজে ক্লাশ হবেনা, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কলেজ ক্যাম্পাসে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী বর্ণা নাটকে পারফর্ম করবে। বর্ণা তাই সেজেগুজেই বেড় হয়েছিলো কিন্তু রামসাগর পর্যন্ত আসতেই সেই পুরোনো কাহিনী।
তোমার কী লাজ শরম নেই? মেনাজ মন্ডলের ছেলে সবুজকে খেকিয়ে ওঠে বর্ণা।
সবুজ মিষ্টি করে হাসে, বলে- তোর লগে দুহান কতা কইতাম বর্ণা?
বর্ণা আর সবুজদের বাড়ি একই পাড়ায়। তবে দুই পরিবারের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সবুজের বাবা চোরাকারবারী। সে ইন্ডিয়া থেকে নানান জিনিসপাতি চোরাই পথে এনে তা স্থানীয় স্মাগলারদের কাছে বিক্রি করে। দু’একবার জেলও খেটেছে । তার এখন বয়স হয়েছ, তার কাজে যোগ দিয়েছে সবুজ। চিনি, জিরা, এলাচ ইত্যাদি নানান পদের মশলা-পাতি ওপার থেকে আনবে তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ইন্ডিয়ান শাড়ি কাপড়ের। ইদানীং গরুও আনছে। গরুপ্রতি একশো টাকা পায় । কাজ বেশি কিছুনা, এনায়েতপুর সীমান্ত ফাড়ির ওপার থেকে মাত্র দু’কিলোমিটার জায়গা পার করে দেয়া। খানপুর রাস্তায় ইদ্রিস চেয়ারম্যানের লোকেদের ট্রাক রেড়ী করা থাকে। ট্রাক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলেই কড়কড়ে নোট। একেবারে টাটকা পয়সা।
তবে কাজটিতে রিস্ক আছে
যেকোন মুহূর্তে ধরা পড়ার সম্ভাবনা ধাকে। আর বিডিআরের হাতে একবার ধরা পড়লে কম হলেও পাঁচ হাজার নগদ। নইলে জেলের ভাতে কোনো মাফ নেই। এসব কাজ অবশ্য সবুজের ভালো লাগেনা।
সবুজ কিছুটা উদাসীন টাইপের। দেখতে শুনতে সুপুরুষ, সুঠাম দেহের অধিকারী সবুজ শৈশবেই তার মাকে হারিয়েছে। ঘরে তার সৎ মা। প্রাইমারীর পর আর লেখাপড়া হয়নি। একই ক্লাশে পড়তো বর্ণার সাথে। সবুজের গানের গলা বটে। এখনও গান-বাজনায়ই সময় কাটে তার। নেয়েত পেটের দায়ে চোর। অন্য কিছু করার চেষ্টা আছে সবুজের কিন্তু ইদ্রিস চেয়ারম্যানের কথার উল্টা যায় কী করে? তার বাবা মেনাজ মন্ডলেরও সে ক্ষমতা ছিলো না। মেনাজ মন্ডল তিন বার জেল খেটেছে। বিডিআরের হাতে মার খেয়েছে বহুবার। শরীরে নেহায়েত অসুস্থ নইলে ইদ্রিস চেয়ারম্যানের শ্যেন দৃষ্টি থেকে এলাকার এই সব ভুমিহীন, প্রান্তিক মানুষগুলোর বাঁচার উপায় আছে? সে যাই হোক। সেই কুখ্যাত ছেচরা চোরাকারবারীর পোলা সবুজ কীনা প্রেম নিবেদন করতে চায় মোকাব্বর মাস্টারের মেয়ে বর্ণাকে!
বর্ণা বলে-
লাজ শরম তো নাই, কাম করো চোরাচালানীর এর মধ্যে চান ধরার আশা??
অপমান বোধ করে সবুজ। সত্যিই তো বামুন হয়ে কী চাঁদ ধরা যায়? সে কোন রা করেনা তবে অদ্ভুত সুন্দর দুটো চোখ তুলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বর্নার দিকে।
ইদ্রিস চেয়ারম্যান এই নিয়ে তিনবার নির্বাচিত। বর্ণার বাবার সাথে তাার বিরোধ বলতে গেলে জন্ম থেকেই। মোকাব্বের মাস্টার আদর্শবাদী মানুষ। নির্বাচনে বরাবরই ইদ্রিসের বিপক্ষে সাপোর্ট করেন কিন্তু ভোটের বেলা কেমনে যেনো ইদ্রিসই হয়ে যান। একটা স্মাগলার ছল-ছাতুরী করো নির্বাচিত হবেন এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কিন্তু মাস্টার বিস্মিত হন যে মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত যখন এই কারবারীর পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। গেলো বছর মোকাব্বের মাস্টার ইন্তেকাল করলে ইদ্রিস চেয়ারম্যান এসেছিলেন তাদের বাড়ি। কেঁদেছেনও সবার সামনে। কিন্তু বর্ণা জানে এ কান্না একেবারেই কুমিড়ের।
বর্ণা আর কথা বাড়ায়না সে রামসাগর থেকে একটা রিকশা নিয়ে চলে যায় কলেজের দিকে।
নাটক চলছে, নাটকের নাম ‘ওরা কদম আলী’। বর্ণ এতোক্ষণ সাজঘরেই ছিলো। কেবিএম কলেজের খোলা মাঠে নাটক। এ নাটকের বিশেষ একটি চরিত্রে পারফর্ম করছে বর্ণা। কলেজের ছাত্র শিক্ষক সবার মাঝেই বর্ণার সমাদরটা একটু আলাদা।
বর্ণা শরীরে কিছুটা শ্যামলা হলেও রুপে গুনে তার সামনে দাঁড়াতে পারে কলেজে দ্বিতীয় কেউ নেই। তার উপরে কলেজের সকল কালচারাল প্রোগ্রামে তার অগ্রণী ভূমিকায় ছাত্র শিক্ষক যারপরনাই সকলের কাছে সে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
নাটক শুরু হচ্ছে, সকল কলাকুশলী সমবেত হয়ে উদ্ভোধনী সঙ্গীতের জন্যে মঞ্চে এসেছে। সহসাই সবুজের চোখে চোখ পড়ে যায় বর্ণার। পড়নে একখানা লুঙ্গী, গায়ে টি শার্ট পড়ে গোবেচারা হয়ে সমুখ সাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। সে যে অনেকক্ষণ ধরে বর্ণার দিকেই তাকিয়েছিলো তা তাকে দেখামাত্র বুঝে ফেলে বর্ণা।
মূলতঃ কলেজে কোন কালচারাল প্রোগ্রাম হলেই সবুজ আসবে। আসে বর্ণার টানে। তবে সবুজের কন্ঠস্বর খুব ভালো। দেশাত্ববোধক, ভারতীয় আধুনিক তার গলায় চমৎকার শোনায়। কলেজ কর্তৃপক্ষ সবুজকে চেনে। তাই খোলা স্টেজে সবুজকে প্রায়ই আহবান জানায় কলেজের কালচারাল কমিটি।
আজও নাটকের দু’এক দৃশ্যের পরেই সবুজের গান আছে। সবুজের গান বর্ণা খুব মন লাগিয়ে শোনে। তার মনে হয়ে প্রতিটি গানই বর্ণাকে উদ্দ্যেশ্য করে সবুজ গায়। আজ কোন গান করবে কে জানে। বর্ণাদের উদ্বোধনী সঙ্গীতের পরই প্রথম দৃশ্য। বর্ণা সে দৃশ্যে মঞ্চে আসলে সবুজ একেবারে মঞ্চের কাছাকাছি চলে আসে। বর্ণার ভালো লাগে, সে সবুজের দিকে কয়েকবার তাকায়। বর্ণার মনে হতে থাকে সে শুধু সবুজের জন্যেই পারফর্ম করছে। বর্ণা মনে মনে লজ্জা পায়। এসব কী ভাবছে সে।
সাজঘরে গিয়ে বর্ণা সবুজকে ডেকে নেয়, জিজ্ঞেস করে-
কীরে তোর গান আছে নাকি?
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে সবুজ।
বর্ণার চোখে চোখ রাখতে পারেনা সে। বলে যাই?
কোন গান করবি?
বর্ণার বলতে ইচ্ছে করে “ভালো বাসলেও সবার সাথে ঘর বাঁধা যায়না” এই গানটি যেন গায় সবুজ। কিন্তু বলতে পারেনা। সবুজ বলে ইন্ডিয়ান আধুনিক গাইবে, বলেই চলে যায়।
সবুজ কম কথা বলে, অনেকটা গোবেচারা টাইপের চেহারা। সেই ছোট বেলা থেকেই বর্ণা দেখেছে, সবুজ কাছে এলেই ওর কেমন যেন ভালো লাগে কিন্তু সবুজকে বর্ণা কখনও কিছু বলতে পারেনা। সবুজরা হত দরিদ্র, হাভাতে। বলতে গেলে মোকাব্বের মাস্টারের বাড়িতে কাজকর্ম করেই কাটাতো সবুজের পূর্ব পুরুষ কিন্তু ইদ্রিস চেয়ারম্যান সবুজের সহজ সরল বাবা মেনাজ মন্ডলকে দিয়ে চোরাকারবারী কাজ শুরু করালে সবুজদের সাথে বর্ণাদের পরিবারের দুরত্ব বেড়ে যায়।
নাটকের তৃতীয় দৃশ্যের পড়েই সবুজের ডাক পড়ে। দর্শকদের প্রায় সবাই সবুজক চেনে তারা হর্ষ ধ্বনি দেয়। সবুজ মৃদু অর্কেস্ট্রার তালে মান্না দে’র বিখ্যাত সেই গানটি গেয়ে ওঠে-
“জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই
পাছে ভালোবেসে ফেলি তাই দূরে দূরে রই।”
তম্ময় হয়ে শোনে দর্শকরা। তারা হর্ষ ধ্বনি দেয়, কেউ কেউ শিষ কাটে। বলে-
ওয়ান মোর, ওয়ান মোর।
সবার অনুরোধ সবুজ আবারও গায়। এবার তার কন্ঠে বিচ্ছেদ গানে সুরের মুর্ছনা তোলে-
“আমি তোর পীড়িতের কাঙাল ও তুই চাইয়া দেকনা এক নজর”—-
আনন্দে মেতে ওঠে দর্শক স্রোতা। পেছনে সাজঘরে বুক ভেঙে যায় বর্ণার। পাছে কেউ দেখে ফেলে তাই ওয়াশ রুমে চলে যায় সে।




অসাধারণ লেখা
কৃতজ্ঞতা
পরের পর্ব
বাংলাদেশের উত্তর জনপদের গল্প। যৌবনে দশ বছর বিজিবিতে কাজ করেছি। সময়টা ছিলো ১৯৮৫-১৯৯৬
ঐ সময়ের মধ্যে তিন বছর ছিলাম দিনাজপুর সীমান্তে। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে উপন্যাস ‘বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি’।
কারো ভালো লাগলে শ্রম সার্থক হবে বলে মনে করি।
[4386]dichoso777 Login Oficial | Slots Online y Depósitos Rápidos SPEI,Accede a dichoso777 para disfrutar las mejores slots online en México. Descarga nuestra app y aprende a jugar ruleta con depósitos rápidos vía SPEI. ¡Regístrate hoy! visit: dichoso777