কেবিএম কলেজে চলছে থিয়েটার। স্টেজের পিছনে সন্ধ্যের আবছা আলোয় বর্ণা নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সবুজের মুখের দিকে। আজ তার সামনে নতুন এক সবুজ। নারী সম্পর্কে সবুজের কথায় বর্ণা তার চোখের দিকে তাকায়, বুঝতে চেষ্টা করে সবুজের মনের ভাব। বলে-
কী এমন বলেছি যে নারীর হিসেব মিলাতে গম্ভীর হয়ে গেলে?
সবুজ কিছু বলেনা। ফের দু’জন নীরব হয়ে যায়। বর্ণা ভাবে সবুজ তার চেয়ে ঢের বুদ্ধিমান এবং সংযমীও। সেই বাল্যকাল থেকে দিনরাত তারা একত্রে হেসে খেলে মানুষ। লিচু বাগান থেকে লিচু পাড়া, আম বাগানে আম কত ঘটনাই না মনে পড়ছে বর্ণার।
একবার তার বাবা মোকাব্বের মাস্টারের ছন ভিটায় হারিয়ে গিয়েছিলো দু’জন। সে তো সেদিনের কথা। বর্ণার বাবা তখনও বেঁচে আছেন।
তখন শরৎকাল, বর্ণা সবে এসএসসি পাশ করেছে, সদ্য যৌবনবতী এক উচ্ছ্বল তরুণী। কলেজ থেকে ফিরছিলো বর্ণা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, মাগরিবের আযানের খুব বেশী বাকী নেই। খানপুর ক্যাম্পের সামান্য পশ্চিমে আসতেই সবুজের সাথে দেখা।
খালি গায়ে, লুঙ্গী কাছা দিয়ে ভারবাঁশে ইন্ডিয়ান মালামাল নিয়ে দ্রুত হাঁটছে সবুজ। হাঁটার তালে তালে তার শরীরের মাংসপেশীগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। মেদহীন শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাজে শিল্পীর কারুকাজ করা এক শ্রমজীবি যুবক। তাকে দেখে বর্ণা অনেকটা চমকে গিয়েছিলো। উদাম থাই, পায়ের নিম্নভাগ, কোমরের উপরিভাগ, বুকের মাংশপেশী যেন ফালাফালা হয়ে বেরিয়ে আসছে।
অস্তমিত অস্তরাগে সবুজ সন্তর্পণে আগে আগে আর বর্ণা তার পেছন পেছন হাঁটছে। টহল পার্টির ভয়ে লুকিয়ে আসার জন্যে সবুজ ছন ভিটার মধ্যে ঢুকেছে আর বর্ণাও তাড়াতাড়ি যাবার জন্যে। দু’জনের দেখা হয়ে গেলে দু’জনই টহলরত সৈনিকদির টার্গেট হয়ে যায়। এ অবস্থায় ধরা পড়লে বর্ণা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবেনা।
ছনভিটার ঘন জঙলার মধ্যে স্মাগলার আছে বলে টহল পার্টি সন্দেহবশত অ্যমবুশ পেতে রেখেছে। ভয়ে দু’জন ঘণ্টাখানেক ছনের অন্তরালে লুকিয়ে বসে থাকে। চির পরিচিত দু’টি সদ্য জওয়ান যুবক যুবতি এই প্রথম পরস্পরের শরীরের এতোটা কাছাকাছি আসে। একজনের শ্বাস প্রশ্বাস অন্যজনকে স্পর্শ করে যায়।
টহল দলের ভয়, কেউ দেখে ফেলার ভয় তবু সবুজ ঠাট্টা করে বলে –
সাবধান বর্ণা, ঐ দেখো- ঐদিকে জোঁক থাকতে পারে।
এ কথায় আচানক সবুজকে জড়িয়ে ধরে বর্ণা। দু’জন দু’জনের বাহুডোরে বন্দী কিন্তু সে নিমেষের জন্যে। সবুজের মনে একবার ইচ্ছে জাগে বর্ণার কাঁপা ঠোটের উপর নামিয়ে আনতে চায় নিজের ক্ষুধার্ত দু’টি ঠোট। আদর সোহাগে সিক্ত করতে চায় শৈশব খেলার সাথীকে। কিন্তু বাঁধ সাধে তার আজন্ম লালিত সংস্কার। তার ভেতর থেকে কে যেন তীব্রস্বরে বলে না, এ অন্যায়। বাঁধন খুলে দেয় সবুজ, বলে –
চলো, টহল পার্টি চলে গেছে। আমরাও বাড়িমুখো হই। এ ঘটনা বর্ণার ভেতরটাকে তছনছ করে দেয়, মনে প্রাণে সে পাগলের মতো সবুজকে পেতে চায়।
আজ এমুহুর্তেও বর্ণার অবচেতন মন চায় সবুজ তার সুকঠিন বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করুক তাকে। তার ইস্পাত কঠিন শরীরের মাঝে পিষে ফেলুক বর্ণার কামনাদীপ্ত সুকোমল শরীরখানা।
মঞ্চে চলছে নাটক, সবুজও তার প্রিয় মানুষটিকে এক দৃষ্টে দেখছে। সময় যেন থমকে গেছে, ভুলেছে তার স্থান কাল। তবু নীরবতা ভেঙে সবুজ বলে-
যাই, একটু পর আমার গান আছে।
সম্বিত ফিরে পায় বর্ণাও মনে মনে শংকিত হয় সে, সবুজকে জামা প্যান্ট বানিয়ে দেয়ার কথাটা হাসান টেইলার তার মামাদের বলে দিতে পারে। সে সবুজকে ডেকে বলে-
জামা প্যান্ট যে আমি বানিয়ে দিচ্ছি একথা কিন্তু কাউকে বলবে না।
সবুজ কিছু বলেনা, নীরবে বর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজেকে তার খুব ছোট মনে হয়। বর্ণা মেয়ে মানুষ হয়েও তাকে জামা কাপড় দিচ্ছে অথচ পুরুষ মানুষ সবুজ তার আর্থিক দৈন্যতার কারনে তা পারছে না। নীরবে মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নেয় সবুজ। বলে-
এসব কিসের জন্যি?
বর্ণা আবারও ঝাঁঝিয়ে ওঠে- কী বললে?
কই? কিছুনা, কী কইমু?
বর্ণা প্রসঙ্গ পাল্টে বলে- একটু পরেই তোমার গান না?
হ্যাঁ মাথা নেড়ে জানায় সবুজ। সে বর্ণার চোখে চোখ রাখতে পারেনা।তারপর বলে- যাই?
যাই মানে? আমি কী যাইতে কইছি নাকি? বলে-
কোন গানটা করবা আজ?
জানিনা, তুমি কইয়া দাও।
বর্ণার বলতে ইচ্ছে করে “ভালো বাসলেও সবার সাথে ঘর বাঁধা যায়না” এই গানটি যেন গায় সবুজ। কিন্তু বলতে পারেনা, বলে গাইবা তুমি আমি কইতে যামু ক্যা?
শেষে সবুজ বলে ইন্ডিয়ান আধুনিক গাইবে সে, বলেই চলে যায়।
সবুজ সব সময়ে কম কথা বলে, অনেকটা মুখচোরা টাইপের। সেই ছোট বেলা থেকেই বর্ণা দেখেছে, সবুজ কাছে এলেই ওর কেমন যেন ভালো লাগে কিন্তু সবুজকে বর্ণা কখনও কিছু বলতে পারেনা। সবুজরা হত দরিদ্র, হাভাতে। বলতে গেলে মোকাব্বের মাস্টারের বাড়ির পঁচা বাসি খেয়েই বড় হয়েছে। কিন্তু মাত্র দু’এক পুরুষ আগেও মণ্ডল বাড়ির নাম ডাক ছিলো। দারিদ্রতার সুযোগে করম চেয়ারম্যান সবুজের সহজ সরল বাবা মেনাজ মন্ডলকে দিয়ে চোরা কারবারী শুরু করালে সবুজদের সাথে বর্ণাদের পরিবারের দুরত্ব ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।
নাটকের তৃতীয় দৃশ্যের পড়েই সবুজের ডাক পড়ে। দর্শকদের প্রায় সবাই সবুজক চেনে তারা হর্ষ ধ্বনি দেয়। সবুজ মৃদু অর্কেস্ট্রার তালে মান্না দে’র বিখ্যাত সেই গানটি গেয়ে ওঠে-
“জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই
পাছে ভালোবেসে ফেলি তাই দূরে দূরে রই।”
বিস্ময়কর কন্ঠ, ঠিক যেন মান্নাদে নিজেই গাইছেন। তন্ময় হয়ে শোনে দর্শক-স্রোতা। তারা হর্ষ ধ্বনি দেয়, কেউ কেউ শিষ কাটে। বলে-
আরেকটি হোক। ওয়ান মোর, ওয়ান মোর।
সবার অনুরোধ সবুজ আবারও গায়। তবে এবার তার কন্ঠে বিচ্ছেদ গানের সুর, সে সুরের মুর্ছনা তোলে-
“আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো
জ্বালো আগুন আরও জ্বালো ঢালো আরো ব্যথা ঢালো।”
আনন্দে মেতে ওঠে দর্শক শ্রোতা। বর্ণা পেছনে সাজঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিলো। সবুজের গানের কথা আর শরীরের ভঙ্গীগুলো তার বুকে আছড়ে পড়ে। হঠাৎ শিহরিত হয় মোকাব্বের মাস্টারের মেয়ে বর্ণা। বিস্মিত হয় এই ভেবে যে, সবুজ কখন কোন ফাঁকে যেন তার স্বপ্নপুরুষ হয়ে উঠেছে।
বর্ণা নিজে নিজে লজ্জিত হয় আবার সবুজের জন্যে গর্বও হয়। সে প্রতিজ্ঞা করে যেমন করেই হোক সবুজকে সে স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে আসবে। তাকে ছাড়া সে বাঁচবে ন্। তখনও বর্ণার কানে অনুরণন হতে থাকে-
“আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো।”
হঠাৎ হু হু করে ওঠে বর্ণার বুকের ভেতর। সে অানমনে বলে ওঠে না,,, না,,, আমি তোমাকে পোড়াবো না। সহসাই সম্বিৎ ফিরে পায় সে। পাছে কেউ তার এই অবস্থা দেখে ফেলে তাই দৌড়ে সাজঘরে ভেতরে চলে যায় । ওয়াশ রুমে ঢুকে চোখ মুখে পানি দেয় বর্ণা।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৬) | আনোয়ার হোসেন বাদল
Leave a Comment



