জীবনের সব ক্ষেত্রে এতটা হিসেবি হলে চলে না!
মাঝে মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভীষণ বেহিসাবি হতে হয়…
কোনো এক হেমন্তের নরম রোদ মাখা বিকেলে একটা শান্ত দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ এই কথা গুলো বলেছিলো!
মনে আছে আমার…
সম্ভবত তার পরে আমাদের আর দেখা হয়নি!
বেকারত্ব নিয়ে খুব বাজেভাবে কিছু কটাক্ষ কথা বলেছিলাম আমি!
বাড়িতে বিয়ের প্রেশার,আর ওর কিছু করতে না পারা,সমস্ত রাগটা সেদিন উপরে দিয়ে এসেছিলাম!
অনিরুদ্ধ তখনো নির্লিপ্ত – প্রচন্ড ঠান্ডা মাথায় আমাকে বোঝাচ্ছিলো,
আমাকে ছাড়া যে ও কি ভীষণ অসহায়!
খুব কাতর কন্ঠে বলেছিলো-
আর একটা বছর অপেক্ষা করো, নয়তো পালিয়ে চলো আমার সাথে!
দ্যাখো, সবকিছুই সময়ের সাথে সাথে ঠিক হবে,কিন্তু তুমি-আমি যদি দু-দিকে ছিটকে যাই এই ধাক্কায়,
আমরা আর এক হবোনা হয়তো কোনোদিন!
সেদিন ওর কোনো কথা কানে নেইনি আমি!
আমার চোখে তখন ও কেবল একজন হেরে যাওয়া মানুষ মাত্র,
প্রেমিকার চোখ সেদিন অন্ধ ছিলো আমার!
আমি কেবল হিসেবের চোখে দেখছিলাম,
ওর কোনো চাকরি নেই,কোনো ভবিষ্যৎ নেই,
তাই- ওর অপেক্ষায় থেকে সময় অপচয় করার কোনো মানেই হয়না!
অথচ – সেদিন প্রেমিকার চোখে ওর দিকে তাকালে বুঝতে পারতাম,
ও কতটা যত্ন পুষে রেখেছিলো আমার জন্য!
সেদিন আমি ওর সবকিছু উপেক্ষা করে গিয়েছিলাম!
ওর ছলোছলো চোখের চাহনি,কাতর কন্ঠের আকুতি,
বিনয়ের স্বরে বলা সমস্ত ভালোবাসার কথা!
সব উপেক্ষা করে গিয়েছিলাম! সব….
হিসেবের চোখ মেলে বাসায় ফিরে বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুতি নিছিলাম!
ভাবছিলাম – বাবারা তো মেয়ের খারাপ চায়না,নিশ্চয়ই আমার জন্য উপযুক্ত কাউকেই পছন্দ করেছেন!
বাবার পছন্দের পাত্র যেদিন আমায় দেখলো,
কিচ্ছুটি বললো না!
তবে– বাড়ি ফিরে জানিয়ে দিলো আমাকে তার পছন্দ নয়….
তিনি সরকারি চাকুরে,আমার মতো শ্যামবর্ণের মেয়েকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়!
তার নাকি চাই আগুনবরণ রুপ!
তারপর??
তারপর – জীবনটা কেমন অন্যরকম হয়ে গেলো!
পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো ছিলাম বলে,জেদ চেপে গেলো!
শ্যামবর্ণের অপমানটা নিতে পারলাম না কোনোভাবেই,
পড়াশোনা করলাম দিনরাত!
হিসেবের চোখটা আমার তখনো খোলাই ছিলো!
তাই নিজের ক্যারিয়ারটা গড়লাম খুব শক্তভাবেই!
তখন আমি নামকরা ইউনিভার্সিটির প্রভাষক!
চারিদিকে তখন খুব নাম আমার!
বিয়ের প্রস্তাব আসছে বড় বড় জায়গা থেকে…
কিন্তু আমার মনে ভীষণ ভাবে থেকে গেলো অনিরুদ্ধ!
আজকাল ওর কথা ভীষণ মনে পড়ে!
মনে হয়– ওর সাথে করা অন্যায়টা ঠিক সময়মতো আমি ফেরত পেলাম!
আজকাল আর ওর দেখা মেলেনা!
হয়তো আছে কোথাও- উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে উদাসীন মনে হাঁটে হয়তো এখনো বিকেলের রাস্তায়!
হয়তো এখনো কাউকে খুব যত্ন করে বোঝায়, জীবনের সবক্ষেত্রে হিসেবি হতে নেই!
অনিরুদ্ধ….
আমিও আর পাল্টালাম না জানো তো?
এই দ্যাখো,এখনো আমি বড্ড হিসেবি!
প্রতিদিন হিসেব করে চলি- আজ কতটা বছর,কতটা দিনের কতটা ঘন্টা তোমার সাথে কথা হয়নি আমার!
একসাথে হেঁটেছিলাম সেই কবেই…
সেদিনের নামটাও ভুলতে বসেছি!
অথচ – আমি হিসেব করি!
অনিরুদ্ধ…
মাঝে মাঝে নিজের ওপর খুউব রাগ হয় জানোতো?
কেনো যে,আমি সেদিন তোমার চোখের যত্নটা দেখতে পেলুম না!
দেখতে পেলে হয়তো আজকে তোমার-আমার একটা চড়ুইভাতির মতো সংসার হইতো, তাইনা অনিরুদ্ধ?
ছোট্ট একটু পৃথিবী অনিরুদ্ধ! – যদি এইটুক জীবনে শেষবারের মতো একবার তোমায় চোখের দেখা দেখতে পেতাম অনিরুদ্ধ…
শেষ বারের মতোন তোমাকে বলতে পারতাম-
অনিরুদ্ধ
এখন আর হিসেবে নই আমি! দ্যাখো, হিসেবের চক্রে আমার এখন সব আছে! কেবল তুমি নেই!
অনিরুদ্ধ! – এবার আমি কেবল তোমাকে চাই!
বলো….
আরেকবার ফিরবে কি তুমি এই অবেলায়?



