দিনাজপুর সীমান্ত বাহিনীর ব্যাটেলিয়ন সদরের পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পুনর্ভবা নদী। বাংলাদেশ – ভারতের আন্তঃসীমান্ত এই নদীটি বড়ই চমৎকার। ব্যাটালিয়ন সদরের পূর্ব পাশ দিয়ে সর্পিলাকার বয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে এটি এখানে কাঞ্চন নামে পরিচিত। দিনাজপুর জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি মিলিত হয়েছে মহানন্দার সাথে। এই চৈত্রে কাঞ্চন এখন একেবারেই শুকনো, পায়ে হেঁটে পারাপার হওয়া যায়। স্বচ্ছ বালির উপর দিয়ে প্রবাহমান জলস্রোত ডালিমের রসের মত টলটলে। কাঞ্চনের রূপ বড়ই মাধুর্যময়। শহরের পূর্ব পাশে কাঞ্চন রেল ব্রিজের উপর উঠে দাঁড়ালে নদীর মনি-কাঞ্চন সৌন্দর্য পীপাসুদের পরাণ ভরিয়ে দেয়। এখানটায় নদী সামান্য বাঁক নিয়ে সোজা চলে গেছে উত্তর দিকে।
এই নদীর পাশেই কুঠিবাড়ি, ইংরেজ নীল সাহেবদের কুঠি। পুরোনো আমলের সেই বাড়িতে সিপাহী শামীম আর হাবিলদার আক্রাম আলীর লোকাল হেড কোয়ার্টার, তার এক পাশে মিশন স্কুল পার হয়ে বিশাল ডিসি মাঠ। ডিসি মাঠের পাশ দিয়ে যে সড়কটি উত্তর দিকে চলে গেছে সেটি গিয়ে মিশেছে ভারত সীমান্তে। সড়কের দু’ধারে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লিচু বাগান। কোথাও কোথাও দিগন্ত বিস্তৃত বাঁশ বাগান। দিনাজপুরের লিচু, আম আর বাঁশ খুবই বিখ্যাত।
এই সড়ক ধরে কতোদূর গেলেই সামান্য উত্তরে পুলহাটা। পুলহাটায় রয়েছে অনেকগুলো চাতাল। চাতালে দিনরাত লেবাররা কাজ করে যাচ্ছে। ধান মাড়াই থেকে সেদ্ধ করে তা থেকে চাল বের করে বস্তাজাত করে পাঠাচ্ছে দেশের নানান স্থানে। স্মাগলার মেনাজ মণ্ডলের ছেলে সবুজ এরকম একটি চাতালে কাজ করে। চাতালটির মালিক করম আলী চেয়ারম্যান। করম চেয়ারম্যান একাত্তরে রাজাকার থাকলেও বর্তমানে জননন্দিত জনপ্রতিনিধি।
পুলহাটা চাতাল পল্লী পার হলেই সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে দিনাজপুর কেবিএম কলেজ। কলেজের মাঠে আজ মঞ্চস্থ হবে ‘ওরা কদম আলী’ নাটক। কলেজ ক্যাম্পাসে থিয়েটার ইত্যাদির জন্যে যদিও হলরুমের ব্যবস্থা আছে কিন্তু দিনাজপুরের নাটক পাগলা মানুষের ভীরের কথা বিবেচনা করেই খোলামাঠে নাটকটি মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
মাঠে বিশাল প্যান্ডেল করা হয়েছে। প্যান্ডেলের ভেতরে বাহারী সাজে সাজানো হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চের পেছনে ডেকোরেটর দিয়ে সাজঘর প্রস্তুত করে নানান রঙে সাজানো হয়েছে প্যান্ডেল। নাটকের কলা কুশলীরা থাকবেন মঞ্চের পেছনে। সেখান থেকে স্টেজে যাবেন। তাদের যাতায়াতের জন্যে প্যান্ডেল থেকে মঞ্চ পর্যন্ত মাটি দিয়ে রাস্তা বানানো হয়েছে। ঠিক যাত্রাপালার স্টাইল না হলেও অনেকটা সেরকম করে চারপাশে বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে প্যান্ডেল।
শহরের গন্যমান্য লোকেরা আসবেন। তাদের জন্যে মঞ্চের পাশে সোফা পেতে দেয়া হয়েছে। সাধারণের জন্যে চেয়ারের ব্যবস্থা। অন্যরা মাটিতে বসে বা দাঁড়িয়ে দেখবেন। মাটিতেও বিছিয়ে দেয়া হয়েছে চটের বিছানা। টিকেটের সিস্টেম করা হয়নি তবে যারা সোফা ইত্যাদিতে বসবেন তারা ডোনেশনের নামে একটা অংক ঠিকই দিয়ে দিবেন।
‘ওরা কদম আলী’ একটি সামাজিক নাটক। মূলতঃ টাঙ্গাইল জেলায় জন্ম নেয়া প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’ নাটকটিতে উঠে এসেছে শ্রেণি বিভক্ত সমাজ বাস্তবতার অতি সাধারণ চিত্র।
বোবা কদম আলী, নায়েব আলী বেপারী, তাজু,রাবেয়া, ইন্সপেক্টর, সর্দার , চা-ওয়ালা,পিচ্চি, বইওয়ালাসহ বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে নাটকটিতে চিত্রিত হয়েছে আবহমান সমাজের বিভিন্ন ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থা। নাটকে-বোবা কদম আলীর লড়াই এ সমাজের এক চিরন্তন যুদ্ধচিত্র। এ চিত্রের সাথে উত্তর বঙ্গের মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলের সাধারন মানুষরা খু্বই পরিচিত।
রংপুর, দিনাজপুরসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের আর্থ সামাজিক প্রক্ষাপট এবং বাস্তবতা ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থা এবং জলবায়ূর মতই ভিন্ন প্রকৃতির। অার্থিক ও সামাজিক বিবেচনায় দিনাজপুরের মানুষ দু’দলে বিভক্ত। যার ধন সম্পদ আছে তার অঢেল আছে। যার নাই তার কিচ্ছু নাই। এটা সম্ভবত ব্রিটিশ সময়ে জমিদার আমলের একটি প্রভাব। এ অঞ্চলে ইংরেজরা নীল চাষ করাতো। জমিদারী প্রথা বিলোপের পর যারা জমিদার ছিলেন তাদের কর্মচারী পাইক বরকন্দাজরা জমির মালিক হয়ে গেছেন আর ভূমিহীন শ্রেণি আজও ভূমিহীন। মঙ্গা পীড়িত উত্তরবঙ্গে যাদের বলা হয় মফিজ।
মেনাজ মণ্ডলরা এখানে এই দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। বংশীয় ঐতিহ্য আছে কিন্ত মণ্ডল জানে সম্পদহীনের আভিজাত্য কাঁচের দেয়ালের মতো। বাইরে থেকে দৃষ্টি দিলে অন্দর পর্যন্ত দেখা যায়। আর সামান্য আঘাতেই তা ভেঙে পড়ে। তাই মণ্ডল তার বউ ছেলে নিয়ে করম চেয়ারম্যানের অধীনে কাজ করে।
কলেজ প্রাঙ্গনে নাটক শুরু হয়েছে, এ নাটকের বিশেষ একটি চরিত্রে পারফর্ম করছে বর্ণা। কলেজের ছাত্র শিক্ষক সবার মাঝেই বর্ণার সমাদরটা একটু আলাদা।
বর্ণার শরীরের রঙ কিছুটা শ্যামলা হলেও রুপে গুনে তার সামনে দাঁড়াতে পারে কলেজে দ্বিতীয় কেউ নেই। তার উপরে কলেজের সকল কালচারাল প্রোগ্রামে তার অগ্রণী ভূমিকায় ছাত্র শিক্ষক যারপরনাই সকলের কাছে সে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
নাটকের শুরুতে, সকল কলাকুশলী সমবেত হয়ে উদ্বোধনী সঙ্গীতের জন্যে মঞ্চে এসেছেন। সবাই সমবেত কণ্ঠে একটি গানের সুর তুলেছে। সহসাই সবুজের চোখে চোখ পড়ে যায় বর্ণার। পড়নে একখানা লুঙ্গী, গায়ে টি শার্ট অনেকটা গোবেচারা হয়ে সমুখ সাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। সে যে অনেকক্ষণ ধরে বর্ণার দিকেই তাকিয়েছিলো তা তাকে দেখামাত্র বুঝে ফেলে বর্ণা।
বর্ণা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সবুজের চোখের দিকে কটমট করে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে একটা প্যান্ট পড়েও আসতে পারলো না?
আসলে কেবিএম কলেজে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেই সবুজ আসবে। আসে কলেজ কর্তৃপক্ষের আহবানে এবং বর্ণার টানে। সবুজের কন্ঠস্বর খুব ভালো। যেকোন গান তার গলায় চমৎকার শোনায়। কলেজ কর্তৃপক্ষ সবুজকে তাই প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানে ডাকবে।
আজও নাটকের দু’এক দৃশ্যের পরেই সবুজের গান শুরু হবে। সমস্যা হচ্ছে যে, সবুজ আর বর্ণা যে পাশাপাশি বাড়ির মানুষ এবং শৈশবে দু’জনে যে একই স্কুলে পড়েছে এটা কলেজের অধিকাংশ বন্ধুরাই জানে। তাই বর্ণা চায় সবুজ একটু স্মার্ট হয়ে কলেজে আসুক। সবুজের গান বর্ণা কিন্তু খুব মন দিয়েই শোনে। তার মনে হয় প্রতিটি গান তাকেই উদ্দ্যেশ্য করে সবুজ গায়। আজ কোন গান করবে বর্ণা তা জানেনা।
বর্ণাদের উদ্বোধনী সঙ্গীতের পরই নাটকের প্রথম দৃশ্য। বর্ণা সে দৃশ্যে মঞ্চে আসলে সবুজ একেবারে মঞ্চের কাছাকাছি চলে আসে। বর্ণার ভালো লাগে, সে সবুজের দিকে কয়েকবার তাকায়। বর্ণার মনে হতে থাকে সে শুধু সবুজের জন্যেই পারফর্ম করতে এসেছে। বর্ণা মনে মনে লজ্জা পায়। নিজেকে শাসায়, এসব কী ভাবছে সে!
সাজঘরে গিয়ে বর্ণা সবুজকে ডেকে নেয়, বলে-
কালই হাসান টেইলারে যাইবা, একটা প্যান্ট আর একটা শার্টের মাপ দিয়া যাইবা।
সবুজ কিছু বলেনা। মনে মনে ভাবে, কী অদ্ভূত এই মেয়ে মানুষের মন। এদের মুখের কথা আর মনের ভাষায় কী দুস্তর ব্যবধান! রামসাগর বসে কী সব বললো আর এখন কী সব কথা বলছে।
বর্ণা আবারও তাকিদ দেয়-
কী হলো? হাসান টেইলারে যাইবা, মনে থাকবে তো? সবুজ এবারেও কিছু বলেনা, বর্নার দিকে চেয়ে মুচকি হাসে। বর্ণা ধমক দেয়, বলে-
হাসছো কেনো?
হাসছি তোমারে দেইখা।
আমারে দেইখা হাসির কী আছে? নতুন দেখছো নাকি?
নতুনই তো দেখছি। দেখছি রহস্যময় দুনিয়ায় মেয়ে মানুষের মতো রহস্য আর কিছুতে নেই।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৫) | আনোয়ার হোসেন বাদল
Leave a Comment



