ফাঁড়ির প্যারামিটারের সাথেই মাটির তৈরি একটি টুল, তার এক পাশে একটি লিচু গাছ অন্য পাশে একটি আম গাছ। গাছ দু’টোর গোড়ায় বৃত্তাকারে দেড়ফুট উঁচু দেয়াল। দেয়ালের ভেতরে ছোট ছোট গোলাকার পাথরের টুকরো। সে দেয়ালও মাটির তৈরী। মণ্ডল বসে আছে টুলের উপর। তার দু’পাশে লিচু গাছের গোড়ায় ক্যাম্পের কালু আর ধলু নামের দু’টো কুকুর শুয়ে আছে। মনে হচ্ছে কুকুর দু’টোও মণ্ডলের উপর সতর্ক নজর রাখছে।
কালু-ধলু গত কয়েক বছর ধরেই ক্যাম্পের সদস্য, সবার বদলী আছে কালু আর ধলুর বদলী নেই। দেশীয় কুকুর হলেও খুব উন্নত জাতের এই কুকুর দু’টি কিন্তু কর্তৃপক্ষের নেক নজরেই আছে। তাদের দেখাশোনা এবং যত্ন আত্তির জন্যে যারাই এই ক্যাম্পে বদলী হয়ে আসেন তাদেরকেই ব্যাটেলিয়ন সদর থেকে ব্রিফ দিয়ে দেয়া হয়।
এ ফাঁড়িতে মোট তিনটি ঘর। একটি পনেরো-বিশজন সৈনিকদের বসবাসযোগ্য ডর্মিটরি ব্যারাক, একটি ফাঁড়ি কমান্ডারের ব্যক্তিগত কক্ষ এবং অফিসার্স রুম, অন্যটি স্টোর রুম। এ ছাড়াও একটি সেন্ট্রি পোস্ট, বাবুর্চিখানা এবং একটি টয়লেট আছে। সবগুলো ঘরই সুপুষ্ট মাটির দেয়াল দ্বারা মজবুতভাবে তৈরী তবে প্রত্যেকটির উপরে টিনের ছাউনী। আর আছে কালু ও ধলুর শোবার ঘর। তাদের ঘরটি অবশ্য টিনের বেড়া দেয়া একটি গোল ঘর।
মজার বিষয় হচ্ছে ক্যাম্পে নতুন সৈনিকরা বদলী হয়ে এলে কালু আর ধলু পদবী অনুযায়ী ঠিকই বুঝে ফেলে কে ক্যাম্প কমান্ডার আর কে সাধারণ পদবীর সৈনিক। এমন কি কোন উর্ধ্বতন অফিসার ক্যাম্প পরিদর্শনে এলেও কালু-ধলু তা বুঝতে পারে এবং তাদের মতো করে সম্ভাষণ জানাতে কার্পণ্য করেনা।
খানপুর ফাঁড়ির চতুর্দিকে আড়াই ফুট উঁচু মাটির তৈরী প্যারামিটার আছে। শত্রুপক্ষ কর্তৃক কখনও আক্রান্ত হলে সৈনিকরা প্যারামিটারের আড়াল নিয়ে যাতে অস্ত্র চালাতে পারে সে ব্যবস্থা। এটা অনেকটা মধ্যযুগীয় দূর্গের স্টাইলে তৈরী।
মেনাজ মণ্ডলের বসার জায়গাটি খুবই পরিচ্ছন্ন। তবে ক্যাম্পের ভেতরের প্রতি ইঞ্চি মাটিই একেবারে ঝকঝক করছে। নতুন কমান্ডার দায়িত্ব নেবার পর প্রতিটি গাছের হাঁটু সমান চুনকাম করা হয়েছে। সেই গাছের ছায়ায় মেনাজ মণ্ডল রাস্তার দিকে ফিরে বসে আছে।
সামনে দিয়ে চলে গেছে ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তা। দু’একটি গরুর গাড়ি আর বাই সাইকেল ছাড়া তেমন কোন যানবাহন চলাচল করেনা সে রাস্তায়। তবে কাচা রাস্তা হলেও দিনাজপুরের এই শক্ত মাটিতে ট্যাঙ্ক লড়ি চলতেও অসুবিধা নেই। প্রতিদিন অসংখ্য পথিক এ পথে চলাচল করে। সড়কটি এনায়েতপুর থেকে এসে খানপুর বাজার হয়ে রামসাগর অতঃপর সোজা দিনাজপুর শহরের দিকে চলে গেছে। রামসাগর থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত পাকা।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সহসা মণ্ডলের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মনে পড়ে যুদ্ধের সময় এই ক্যাম্পের ল্যান্স নায়েক জব্বারের কথা।
জব্বারের বাড়ি নারায়নগঞ্জ জেলায়। নারায়নগঞ্জ মানে শীতালক্ষ্যা নদীর ওপাড়ে বন্দর থানায়। ক’দিন আগে নতুন বদলী হয়ে এসেছেন খানপুর ক্যাম্পে।
তখন এমনই চৈত্র মাস। দেশজুড়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ দিনাজপুর শহর থেকে এসে সামনের এই সড়ক দিয়ে রাতের বেলা ইন্ডিয়ার মালদহে চলে যাচ্ছে। দিনের বেলাও যায় তবে মাঠের কলাই খেত আর মোকাব্বের মাস্টারদের বাড়ির পেছন দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে যায়।
সীমান্ত ফাঁড়িগুলোতে কর্মরত ইপিআর সৈনিকদের মধ্যে তখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশ্চিম পাকিস্তানের লোক। সুদূর পাকিস্তান থেকে এসে বাংলাদেশে থেকে চাকরি করছে বছরের পর বছর। অনেকে ফ্যামিলী নিয়েও থাকছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে খানপুর ক্যাম্পের দায়িত্বে পাকিস্তানী কমান্ডার আরমান আলী। আরমান আলী জব্বারসহ তিনজন বাঙালি সৈনিককে বেঁধে রেখেছেন। ক্যাম্পের অন্যান্য বাঙালি সৈনিকরা পালিয়ে গেছেন কিন্তু আশেপাশের ক্যাম্প থেকে আবার পাকিস্তানী সৈনিকরা এসে খানপুর ক্যাম্পের দখল নিয়েছে। সেইসব পাকিস্তানী সৈনিকদের খাবার সাপ্লাইসহ সকল কাজে সাহায্য করছেন করম চেয়ারম্যান। করম চেয়ারম্যানের তখন বিশাল ক্ষমতা। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করম আলী, মুসলিম লীগের লোক।
আজকের এই অপেক্ষমান অলস সময়ে মণ্ডলের মনের সেলুলয়েডে ভেসে উঠছে আরমান আলীর নৃশংস কর্ম কাণ্ডের সেইসব দুঃসহ স্মৃতি । ল্যান্স নায়েক জব্বারকে রাইফেলের বেওনেট দিয়ে কীভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিলো আরমান। মালোপাড়ায় হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর মালতি, রেবতি আর তাদের মাকে ধরে এনে কিভাবে ধর্ষন করে হত্যা করেছিলো তারা।
মালতির বাবাকে স্টেনগানের গুলিতে ঝাঝরা করে দিয়েছে। ধরে এনেছি তিন নারীকে। মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করেছে সেই পশুরা। একজনকে পালাক্রমে সাত আটজনে ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করেছে। মেনাজ মণ্ডল অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখেছে সেইসব দৃশ্য আর ঘৃণায় নাকমুখ কুঁচকে থুথু ফেলেছে।
মেনাজ মণ্ডল তখন ক্যাম্পের ইনফর্মার। কমান্ডার আরমান আলী রেবতী নামের মেয়েটিকে ধর্ষণের পর ঘর্মাক্ত শরীরে গোলঘরে বসে মেনাজকে বাতাস দিতে বলে। একটি সিগারেট ধরিয়ে মণ্ডলকে ডেকে বলে-
কেয়া বাত মণ্ডল?
জ্বী সাব বাত খুব আচ্ছা হ্যায় সাব।
তুম হিন্দু হো ইয়া মুসলিম?
প্রশ্ন শুনে মণ্ডলের কলজেটা হঠাৎ ধক করে উঠে, পাকিস্তানীরা হিন্দু পাড়া, মহল্লায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। তার সামনেই রেবতী, মালতি আর তাদের মাকে ধর্ষণ করছে।
ভয়ে ভয়ে মণ্ডল বলেছিলো- হামলোক মুসলিম হ্যায় সাবজি।
লেকিন মণ্ডল নাম কিসনে দিয়া? ইয়ে নামছে লাগতা হ্যায় তুম হিন্দু হো।
ভয়ে আত্মা শুকিয়ে গিয়েছিলো মণ্ডলের। কাঁদ কাঁদ গলায় মণ্ডল বলেছিলো নেহী সাব হামলোগ সাচ্চা মুসলিম হ্যায়।
ঠিক হ্যায়, আগার তুম মুসলিম হ্যায় তো কলেমা বাতাও,,,
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে মণ্ডল পড়েছিলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।”
ফের আরমান আলী বলেছিলো –
মুক্তি মোকাব্বের মাস্টারকো পাতা লাগাও। মোকাব্বের বহুত খতারনাগ আছে। তারপর লালসার দৃষ্টি নিয়ে বলেছিলো উচকো বিবি দেখনেছে ক্যায়সা হ্যায়?
মণ্ডল কিছু না বুঝেই বলেছিলো আচ্চা হায়, বহুত খুব সুরত হ্যায়।
তবে মণ্ডল জানতো মোকাব্বের মাস্টারের স্ত্রীকে আরমান খুঁজে পাবেনা। তারা ইন্ডিয়া চলে গেছে।মাস্টার ইপিআরের দু’জন বাঙালি সৈনিক নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার একটি দল গঠন করেছেন। তারা পাশের এনায়েতপুর আর হরিদেবপুর ফাঁড়ির অস্ত্র গোলাবারুদ কব্জা করে ইন্ডিয়ার মালদহ শহরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে। মণ্ডল ইনফর্মারী করে স্মাগলারী করে এটা ঠিক, কিন্তু দেশদ্রোহী না। এসব খবর সে পাকিস্তানী কমান্ডার আরমান আলীকে কোনোদিন দেয়নি।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৩) | আনোয়ার হোসেন বাদল
Leave a Comment



