ফাল্গুন-চৈত্রের এই সময়টা সীমান্তে স্মাগলারদের মৌসুম। তার উপরে এবার দু’এক মাস পরই রমজান। চিনি, ছোলাবুট, জিরা-দারুচিনিসহ নানান পদের মশলা-পাতির চাহিদা খুব বেশি। সৌদি আরবের নামে ইন্ডিয়ান খেজুর আর নানান ফল-ফ্রুটেরও চাহিদা ব্যাপক। অন্যান্য বছর এ সময়ে ইন্ডিয়ান গরুতে সয়লব হয়ে যেত।
তাছাড়া আসন্ন ঈদ উপলক্ষে শাড়ি, লুঙ্গী ইলেক্ট্রিক মালামালের তো কথাই নেই। মেনাজ মণ্ডলরা এই মৌসুমে ঠিকমতো কাজ করতে পারলে সাড়া বছরের কামাই ঘরে তুলতে পারে অথচ গত পনেরো দিনেও কোন চালান আনতে পারেনি কেউ।
আনবে কী করে? হাবিলদার আক্রাম আলী নাকি স্মাগলার দেখলেই ডাইরেক্ট গুলি করে। খানপুরে আসার আগে আক্রাম আলী ছিলেন রাণী সংকৈল সীমান্ত ফাঁড়িতে। মেনাজ মণ্ডলসহ সব স্মাগলাররাই সেখানের খবর জানে। আক্রাম হাবিলদারের কারনে গত ছয়মাসে রাণী সংকৈলে কোন স্মাগলিং হয়নি। ফাঁড়ি কমাণ্ডার আক্রাম আলীর নাম শুনলেই এলাকা ছেড়ে বাচ্চা-বুড়কো্রত
সব নাকি পালিয়ে যেতো।
মেনাজ মণ্ডল টুলে বসে বসে এসব ভাবছে। সেন্ট্রিপোস্টে দাঁড়িয়ে আছে সিপাহী শামীম। অ্যারারুট দেয়া চকচকে ইউনিফর্মের সাথে হেলমেট পড়ে হাতে রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। দেখতে অবিকল একটি দৃষ্টি নন্দন স্ট্যাচু। প্রহরীর সতর্ক চোখের দিকে তাকিয়ে মণ্ডল ভাবে- আহা সবাই যদি শামীমের মতো দয়ালু হতো!
মাত্র অল্প কয়েক দিনেই শামীম ফাঁড়ি কমান্ডার হাবিলদার আক্রামের ভক্ত হয়ে গেছে। আক্রাম আলীকে নিয়ে তার গর্বের শেষ নেই, ভাবে চাকরি করলে হাবিলদার আক্রামের মতোই করবে। মনে মনে হাবিলদার আক্রামকে স্যালুট করে, শক্ত মাটির উপর মিলিটারি বুটের শব্দ হয় ঠকাস্। চকিতে তার দিকে মুখ তুলে তাকায় মেনাজ মণ্ডল। বলে কারে স্যালুট করলেন?
শামীম কোন জবাব দেয়না, মেনাজ মণ্ডল বিহ্বলতা নিয়ে শামীমের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শামীম লজ্জিত হয়, বলে- কী দেখছেন চাচা?
কীছুনা, তয় আমনে সালাম দিলেন কারে?
ফাঁড়ি কমান্ডাররে।
কই? হেরে তো দেহিনা?
দেহন লাগেনা চাচা, সাচ্চা সৈনিকের ছায়ামুর্তিও ঈমানদারী ডিউটি করে। আক্রাম মেজরজি সেরকম সাচ্চা হাবিলদার। মণ্ডলের সমর্থনের জন্যে বলে – কী ঠিক কইছিনা চাচা?
মণ্ডল কীছু না বুঝেই বলে- হ, ঠিক কইছেন।
মণ্ডল ভাবে, দিনে দিনে সীমান্ত গরম হয়ে উঠছে। সীমান্তের প্রহরীদের মণ্ডলও খুব শ্রদ্ধার চোখেই দেখে তার চোখে বিএসএফ অতোটা কড়া নয় যতোটা এপাড়ের সীমান্ত বাহিনী। মূলতঃ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বঙ্গদেশের সীমান্ত বাহিনীর রয়েছে দীর্ঘ গৌরবময় ঐতিহ্য। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই একটি অভিজাত বাহিনী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের এই প্যারা মিলিশিয়া ফোর্সেস।
দু’শো বছরেরও বেশি আগে দেশের প্রয়োজনে মাত্র ৪৪৮ জন সৈনিক নিয়ে বাহিনীর গোড়াপত্তন হয়েছিল। তখন নাম ছিল রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন। ছয় পাউন্ড গোলা, চারটি কামান এবং দুটি অনিয়মিত অশ্বারোহী দল নিয়ে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন গঠিত হয়েছিল। সীমান্ত এলাকায় সমস্যা বৃদ্ধির কারণে এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে নামকরণ করা হয় ফ্রন্টিয়ার গার্ডস যার সদর দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে।
অতঃপর বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ, ইস্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার্স রাইফেলস ইত্যাদি নামের বিবর্তণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আমলে এ বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস নাম ধারন করে।
দক্ষ নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনার জন্য সামরিক বাহিনী থেকে অধিক যোগ্য সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে বাহিনীর শৃঙ্খলার মান বৃদ্ধি করা হয়।
দেশ স্বাধীনের পর এর নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)।
এদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বাহিনীর রয়েছে গৌরবময় অবদান। যুদ্ধে ইপিআরের ৮০০ সৈন্য শাহাদত বরণ করেন। দেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ও শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আবদুর রউফ এ বাহিনীর সৈনিক।
দেশের প্রায় সারে চার হাজার কিঃমিঃ সীমান্ত রয়েছে ভারতের সাথে আর দক্ষিণ-পূর্বে সামান্য অংশে রয়েছে বার্মা। এই পুরো এলাকার মধ্যে কোনো কোনো সীমান্তের প্রায় শতভাগ মানুষই কোনো না কোনভাবে চোরা কারবারের সাথে জড়িত। আক্রাম আলী খানপুর ক্যাম্পে এসেছেন এই পনেরো দিন এখন পর্যন্ত কোনো কাজই করতে পারেনি মেনাজ মণ্ডলরা।
ক্ষুধার জ্বালা যে কতো কষ্টের আর কত ভয়ঙ্কর তা যে জানে সেই জানে। ক্ষুধা মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দিতে পারে। ক’দিন ধরে মণ্ডলের ঘরে এক গোটা চাল নেই, হাতে দু’টো টাকা নেই।
সকালবেলা না খেয়ে এক কাপড়েই বের হয়েছিলো মেনাজ মণ্ডল। ক্যাম্পে বসে থাকতে থাকতে সহসা তার তলপেট ক্ষুধায় মোচর দিয়ে ওঠে। গত দু’দিন শুধু দু’মুঠো চিড়া ভেজানো পানি আর দু’টো বিচি কলা ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি। করম চেয়ারম্যানের কাছে বিগত কয়েক চালানের টাকা পাওনা আছে কিন্তু চেয়ারম্যানের নিজের মাথাই ঠিক নেই। তিনি এখন তার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। এ অবস্থায় পাওনা টাকা চাইতে যাওয়া ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দেয়ার শামিল। শত হলেও মেনাজ মণ্ডল চেয়ারম্যানের আপনজন, যাকে বলে খাসলোক। তবু সেই চেয়ারম্যানই ভরসা, যদি কিছু পাওয়া যায়!
মণ্ডল তার ছেলে সবুজের কথা ভাবে । ছেলেটি পেয়েছে মাতুল ধারা। পড়ালেখার মন ছিলো, মেধাও ছিলো। মেনাজও চেয়েছিলো ছেলেটি লেখাপড়া করে মানুষ হবে কিন্তু চাইলেই কী সব স্বপ্ন পুরন হয়? হয়না, মেনাজ মণ্ডলদের ভাতের স্বপ্নই পুরণ হয়না, তার উপর মানুষ হবার সাধ!
মণ্ডলের বউ?
সুফিয়াকে যখন বিয়ে করে আনে তখন তার কীই বা বয়স। সুফিয়ার বাবার বাড়ি ভারতে মালদহে। ভালো বংশের মেয়ে সুফি, সেই সুফিকেও পেট পুড়ে দু’বেলা খাওয়াতে পারেনি মণ্ডল। অভাবের সংসারে খেটে খেটেই জীবন শেষ। মণ্ডলকে সেজন্যে কোনদিন দোষারোপ করেনি সুফি কিন্তু মণ্ডলের ভেতরে সুফির জন্যে কষ্ট দানা বেধে আছে আহা কতোদিন গরম ভাতে দু’টো মরিচ দিয়ে গ্রাস তুলেনি মণ্ডলের বউ।
নেহায়েত অভাবের তাড়নায় স্বভাব চরিত্র খারাপ নইলে মণ্ডলের বংশবলীও খারাপ ছিলোনা। ছেলেটা দেখতে শুনতে হয়েছে রাজপুত্র, লেখাপড়ায়ও ছিলো তেমনি। আর কী মিষ্টি সুরেলা গানের গলা।
বছর কয়েক আগের কথা। ছেলেকে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করেছিলো মণ্ডল।এ কথা শুনে করম চেয়ারম্যান ইনফর্মার কুদ্দুসরে ডেকে বলেছ-
কীরে কুদ্দুস, শুনলাম মেনাজ মণ্ডল তার ছেলেরে হাইস্কুলে দিছে?
জ্বে কর্তা, মণ্ডল পোলারে শিক্ষিত করতে চায়।
ইস, ছ্যাপ চলেনা দুধ রোজ। পেটের ভাতই জোটেনা তার উপর আবার লেখাপড়া! তা পোলারে পণ্ডিত বানাবি কী দিয়া রে মেনাজ?
আমনে তো আছেন চেয়ারম্যান সাব যদি একটু সাহায্য টাহায্য করতেন!
আমিও তাই ভাবছিরে। তোর ছেলেটা ভারী মিষ্টিরে মণ্ডল। যাহ্ জীবনে কতো মাইনসের উপকারই তো করলাম। তুইতো আপনই, নিলাম তোর ছেলের দায়িত্বটাও, দিয়ে দে-আমার চাতালে। চোর-টোর পাহারা দিবেনে আর ঐখানে বসেই পড়বেনে। স্কুলের মাস্টাররে আমি কইয়া দিমুনে, কী বলিস? কিন্তু পড়াশোনা ও পর্যন্তই, আর এগুতে পারেনি সবুজ।
কয়েক দিন পরের কথা। কোনো এক মধ্যরাতে স্মাগলাররা মালামাল এনে চাতালের মধ্যে জমা করছিলো। হঠাৎ টহল পার্টি এসে ধরে ফেলে এক কারবারীকে। সবুজও ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে যায় তবে ক্যাম্পের কারবারীদের খাতায় নামটি খোদাই করেই লেখা হয়ে যায় সবুজ মণ্ডলের।
সিজার লিস্টের সাথে এজাহারের সময় সবুজ মণ্ডল, পিতা-মেনাজ মণ্ডল বয়স (১৩) এই নামটি বাদ দেয়ার ব্যপারে আক্রাম কমান্ডার ভেবেছিলেন কিন্তু বাপ যার দাগি স্মাগলার তাকে বাঁচাতে পারে সাধ্য কার।
তারপর থেকে সবুজও স্মাগলার হয়ে যায়। সেও নিয়মিত শুরু করে বাপের কারবার। কখনও বাবার সাথে কখনও অন্যদলে শামিল হয়ে চোরাইপথে আনে নানান জিনিসপাতি। আয় রোজগার যা করে তা নেহায়েত মন্দনা কিন্তু বাবার সংসারে দিবে তেমনটাও হয়ে ওঠেনা সবুজের।
মেনাজ মণ্ডল এখন বয়সের ভারে অনেকটা থিতিয়ে পড়েছে। তবু পেটতো চালাতে হবে তাই জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ ইত্যাদি মশলা পাতি আনা নেয়ার কাজটা করে সে। কিন্তু বর্তমানে তাও বন্ধ, কী করে যে সামনের দিনগুলো যাবে?
এসব ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মেনাজ মণ্ডল। ফের চেয়ারম্যান বাড়ির উদ্দেশ্যেই রওয়ানা হয় যদি টাকা পয়সা কিছু পায় সে আশায়। কিন্তু খানপুর মোড়েই ইনফর্মার কুদ্দুসের সাথে দেখা।
কুদ্দুসকে দেখেই মেনাজের মনে কামড় দিয়েছিলো, যাত্রা ভালো হবেনা। কিন্তু তা যে এতোটা খারাপ হবে তাও বুঝতে পারেনি মেনাজ। সে কুদ্দুসকে একটু তোয়াজ করেই সালামটা দেয়-
স্লামুআলাইকুম, কুদ্দুস ভাই।
কুদ্দুস সালামের কোন জবাব না দিয়েই বলে-
তোমাগো বাড়ির দিকেই যাইতেছিলাম মণ্ডল ভাই। ভালোই হলো দেখা হয়ে।
কী ব্যাপার কওছন কুদ্দুস ভাই? মনে মনে চিন্তা করে, ঘরে এক গোটা চাল নেই। কুদ্দুসের কাছে পঞ্চাশটা টাকা চাইবে কীনা ভাবে সে। ধার চেয়ে পাইলে অন্তত দু’সের চাল, কিছু বাজার-ঘাট করা যেতো।
না, খবর ভালোই। তয় ক্যাম্পে নতুন হাবিলদার আইছে। কাল বিকেলে মিটিং দিছিলো, তুমি মিয়া যাও নাই কেন?
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৯) | আনোয়ার হোসেন বাদল
1 Comment




সুন্দর 🥀