সীমান্তে পাচারকৃত মালের লব্ধ অর্থেরও চমৎকার একটি বন্টনরীতি আছে। এটা শুধু গরু আনা নেয়ার জন্যেই নয় বরং পাচার হয়ে যাওয়া কিংবা আসা প্রতিটি জিনিসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
স্মাগলিংএর এই যে সিস্টেম, এর সাথে দু’দেশের সীমান্ত রক্ষীরাও পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সিপাহী শামীমের ভালো লাগেনা এসব। সে হাবিলদার আক্রামকে জিজ্ঞেস করে-
আচ্চা মেজরজি আপনিতো ঘুষ-টুস খান না তারপরও এবারে এই গরুগুলো আনার অনুমতি দিলেন কেন?
হাসেন হাবিলদার আক্রাম। বলেন- আনতে দিমুনা তয় স্মাগলারগুলান কী না খাইয়া থাকপে? তাছাড়া ক্যাম্পেরওতো খরচাপাতি আছে। সরকারিভাবে যা বরাদ্দ আছে তাও কী সবসময় ঠিকমতো পাও? আর পাইলেও তাতে কী ক্যাম্পের খরচ সংকুলান হয়?
না, তা হয়না। কিন্তু সরকারতো আমাগো বেতন দেয়। টহলের জন্যে টিএ, ডিএ দেয়? জব্দকৃত মালের উপর রিওয়ার্ড দেয়?
হ্যাঁ তা দেয়। কিন্তু তা সত্বেও আবহমান কাল ধরে চলে আসা এই প্রথা কেউ কখনও ভাঙতে পারবেনা শামীম। আর ভাঙলে মেনাজ মণ্ডলের মতো প্রান্তিক মানুষগুলো উপোষ দিয়ে মরবে। বিএস এফ এর সাথেও স্থানীয়ভাবে সম্পর্ক নষ্ট হবে আমাদের। সুতরাং টুকটাক কাজ চলবেই।
তবুও চোরাপথে মালামাল না এনে সরকারিভাবে আনলে দেশের অর্থনীতি মজবুত হতো না? প্রশ্ন করে শামীম।
হাবিলদার আক্রাম রাগ করেন না বরং স্বপ্রশংস দৃষ্টিতে শামীমের দিকে তাকান। বলেন-
তা হয়তো হতো। তবে তুমি আর আমিতো হুকুমের গোলাম মাত্র। আমরা দেশের অর্থনীতি নিয়ে মাথা ঘামালে কী হবে? দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা কী চায় সেটাই আসল।
শামীম স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হাবিলদার আক্রাম বলেন- কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন, কর্তারাই যখন স্মাগলিং চায় তখন তুমি বা আমি কী করতে পারি?
কথাটা বুজলাম না, একটু খোলাসা করুন।
শোন, সবকিছুর মূলে থাকে রাজনীতি। অসৎ কর্মকর্তারা যখন অসাধু রাজনীতিককে ঘুষদিয়ে বদলী হয়ে আসেন তখন তাদের ঘুষের টাকা আদায় করতে আবার ঘুষ খেতে হয়। কিন্তু তাদের ঘুষ দিবে কে? বাধ্য হয়ে স্মাগলিং করিয়ে অবৈধপথে পকেট ভরেন তারা। আর তাদের সে কাজ সম্পন্ন করতে আমরা নির্দয়ভাবে ব্যবহৃত হই। সীমান্তের অতন্দ্রপ্রহরীদের ঐতিহ্যবাহী চেইন অব কমান্ডের মতো অসাধু কর্মকর্তাদেরও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আছে চেইন। সে চেইনে চেইনে দুর্নীতি দৌড়ায়।
শামীম বুজতে চেষ্টা করে মুক্তিযোদ্ধা আক্রাম হাবিলদারের বক্তব্য। কোন প্রশ্ন করেনা। ফের হাবিলদার আক্রাম বলেন-
তাছাড়া ওপাড়ের সাথে আমাদের রয়েছে আবহমান কালের সম্পর্ক। এদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি পুরোটাই তাদের উপর নির্ভরশীল। গোটা বাংলাদেশ ঘিরে আছে তারা। একাত্তরের যুদ্ধের কথাই ধরোনা? তারা না হলে আমরা মাত্র নয় মাসে কী স্বাধীন হতে পারতাম?
শামীম জওয়ান ছেলে, দেশের প্রতি তার মমত্ববোধ অনেক বেশি। কথাটি তার ইগোতে অাঘাত করে। সে বলে
অবশ্যই পারতাম, রক্তের দামেই তো স্বাধীনতা কিনেছি? কারও দয়া বা অনুকম্পায় তো নয়?
হাসেন আক্রাম। বলেন -না, অতো সহজে পারতে না শামীম। তারপর একটু চুপ থেকে বলেন-
একাত্তরে যুদ্ধ করেছি। তখন আমি মাত্র সিপাহী। ছিলাম রাজশাহী সীমান্তে। যুদ্ধ শুরু হলেই পালিয়ে গিয়ে পদ্মা সাঁতরে চলে যাই ইন্ডিয়া। দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধ করি ইন্ডিয়া আমাদের অস্ত্র দেয়, গোলাবারুদ দেয়, খাবার দেয়, আশ্রয় দেয়। তোমার কী ধারনা তারা কী বিনা স্বার্থেই এগুলো দিয়েছিলো?
চমকে ওঠে শামীম, কী বলছেন রণাঙ্গনের এই বীর যোদ্ধা? শামীম চোখ তুলে তাকায়। তার চোখে প্রশ্ন খেলা করে। বলে-
তাদের স্বার্থ তো ছিলোই।
হাবিলদার আক্রাম বলেন-
আমাদের নিত্যদিনের খাবারের দিকে তাকাও, সড়কের যানবাহনগুলোর দিকে তাকাও, বিনোদনের দিকে তাকাও, সংস্কৃতির দিকে তাকাও। সব গ্রাস করে নিয়েছে ভারত। আমরা কী দিয়ে রুখবো? কী আছে আমাদের? আমরা ব্রিটিশদের হঁটিয়ে পাকিস্তান হয়েছি, পাকিস্তান হঁটিয়ে স্বাধীন হয়েছি কিন্তু সত্যি কী আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি?
শামীম কিছু বলে না, হাবিলদার আক্রাম আলী বীর প্রতিকের জ্বলন্ত চোখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে- হ্যাঁ, আমরা সত্যিই অসহায়। সীমান্তে চোরাচালানই শুধু নয়, ভূ-,রাজনৈতিক কারনেই আমাদের আজীবন ভারতের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হবে।
তাহলে ট্রেনিং এর পর আমরা যে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিলাম?
হ্যাঁ, তা তো নিয়েছো কিন্তু যারা শপথ করিয়েছেন তারাইতো গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন। হয়তো তারাও বুঝে ফেলেছেন এ দেশে সততার,নীতি আদর্শের কোন দাম নেই। ওকথা থাক শামীম, ওসব ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে।
সন্ধ্যায় করম চেয়ারম্যান স্মাগলিংকৃত মালামালের পেমেন্ট দিয়েছেন। সে টাকায় বর্ণার জন্যে কিছু কসমেটিক্স, দুটো সালোয়ার কামিজের কাপড় ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে সবুজ। রাত বারোটার দিকে এসে বর্নাদের বাঁশের ঝাড়ে ঠক ঠক করে শব্দ করে সে।
বর্ণা আলতো করে মায়ের স্পর্শ নেয়। বিদ্যুৎহীন ঘরে বুঝে নেয় মা তার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাঁশ ঝাড়ের শব্দ বর্ণার পরিচিত। সে উঠে আসে, সবুজের হাতে প্যাকেট দেখে ফিসফিসিয়ে বলে-
ওতে কী এনেছো?
তোমাকে জীবনে কিছু দিতে পারিনি। নিজেরতো কামাই নেই, আজ কয়টা টাকা হাতে পাইছি তাই তোমার জন্যে বলেই ব্যাগটি বর্নার হাতে দেয় সবুজ। বর্না বলে-
তোমার কী কোনদিনও বুঝ ব্যবস্থা অইবে না? মাল পাচারের টাকায় আমার জন্যে এসব কিনেছো? আমি এগুলো নেবো? সবুজ বলে-
তাইলে টাকা কই পামু? তোমারে দিতে মন চায়। বর্ণা অন্ধকারে সবুজের ডান হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে-
মন চায় ক্যা?
তোমারে ভালোলাগে।
শুধু ভালো লাগে?
হ, ভালো লাগে। তোমারে ছাড়া কিছু ভালো লাগে না সোনাই।
বর্ণা নিজেকে আর সামলাতে পারেনা। হুহু করে ওঠে তার বুকের ভেতর। ঝাপিয়ে পড়ে সবুজের বুকে। সবুজের বাহু বন্ধনে নিজেকে সঁপে দেয় সে।
গভীর রাত সবুজ আর বর্ণা পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে মোকাব্বের মাস্টারের কবরের পাশে। বাড়ির দখিন পাশে বাঁশ ঝাড়ের তলায় মাস্টারের কবর। গ্রামের কোথাও কেউ জেগে নেই। বর্ণার মা জেগে ওঠতে পারেন, বর্ণা আস্তে আস্তে মুক্ত হয়ে বলে-
এহন যাই, তুমি আর কোনদিন গরু আনতে যাইবানা কও?
না যামুনা।
তুমি করম আলীর লগে থাকো তা আমার ভাল্লাগেনা। আবার তোমারে ছাড়া আমার কোনকিছু ভাল্লাগেনা।
দু’জন আবারও দু’জনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা আনন্দে, আবেগে, শিহরণে সিক্ত হয়। আর রাতের এ নীরব মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে থাকেন বর্ণার বাবা মোকাব্বের মাস্টারের বিদেহী আত্মা।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৮) | আনোয়ার হোসেন বাদল
1 Comment




[1415]Stake Casino login at legit slots na gcash sa Pilipinas,Gamitin ang stake casino login para sa mabilis na access. Mag-download ng stake casino app at subukan ang online casino legit gcash. Maglaro na ngayon! visit: stake casino