১.
পশ্চিমের আকাশটা এখনো বেশ ঘোলাটে দেখাচ্ছে, মনে হয় কিছুক্ষণেই বৃষ্টি নামবে আবারও, বোঝাই যাচ্ছে ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন শ্রাবণ মাস বহমান, ট্রেন থেকে নেমেই কেমন ঘোলা চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে মহিব। অবশ্য পরিচিত কারোরই দেখা মিলছে না, না মেলারই কথা, এই এলাকায় প্রথম এসেছে মহিব, ছোট থেকে শহরেই মানুষ সে, অবশ্য দাদু বাড়ি ছিলো গ্রামে,তবে সেটাও ঠিক গ্রাম নয়, শহরই বলা চলে, মফস্বল। তাও এসেছে হাতে গোনা দু চার বার, কিন্তু এবারে একটা লম্বা সময় নিয়ে হয়তো তার থাকতে হবে গ্রামেই।
ট্টেন থেকে নেমে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে লাগলো সে,কোথাও কোন যানবাহন পাওয়া যায় কি না,প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করেও কোনো লাভ হলো না,দু একটা রিকশা অবশ্য পেয়েছিলো,কিন্তু তারা কেউ যাবে না।
রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি, গ্রামের মানুষদের কাছে এটা এখন মধ্যরাত,
কি করে যে থাকবো এখানে? গ্রামে কি কেও থাকতে পারে?
এসব ভাবতে ভাবতে মহিব পা বাড়ালো সামনের দিকে,হয়তো খেয়াঘাট অবধি হেঁটেই যেতে হবে তাকে,নইলে সারারাত এখানেই দাড়িয়ে থাকতে হবে, বর্ষার দিন, থেমে থেমে বৃষ্টি নামছে,মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস বইছে,কখনো সখনো ডালপালা ভেঙে পড়ছে ঝরো বাতাসে,এভাবে তো আর রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা সম্ভব না।
হাঁটতে গিয়ে হটাৎ পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলো,চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার,টর্চ লাইটের আলো নেভালে নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যায় না।
একটু ভয় ভয়ও লাগছিলো,সুনসান অন্ধকার রাস্তা, যদিও মহিব জানে, ভুত বলে কিছুই নেই,তবুও ভয়টা কাটছে না এই মুহুর্তে।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় পৌঁছে গেছে নদীর পাড়ে, এই গ্রামে একটাই বড় নদী, সন্ধ্যা।
নদীর নামটা বড্ড চমৎকার,ঠিক যেন কবিতার মতোন লাগলো,সন্ধ্যা- এমন সুন্দর নামও হয়?
আনমনে ভাবতে থাকলো সে,
বর্ষাকালে এমনিও নদী ফুলেফেঁপে ওঠে,যদিও এখন ভাঁটার সময়,
মাঝিকে আগেই বলা ছিলো,তাই এতক্ষণ তিনি অপেক্ষা করছিলেন মহিবের,
মহিব ঘাটে আসতেই হাঁক পাড়লেন, আইছেন সাহেব?
মাঝবয়সী লোকটার মুখে সাহেব শুনে কেমন বিব্রত বোধ করলো মহিব,
মহিব শহুরের শিক্ষিত ছেলে,শহরের নামকরা ভার্সিটি থেকে অনার্স, মাস্টার্স পাশ করেছে,
একবার ইন্টারভিউ দিতেই তাই তার চাকরি হয়ে গেলো,
মহিব এখন একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক।
এই গ্রামেই তার পোস্টিং হয়েছে, গ্রামে সাধারণত কেউ চাকরি করতে চায়না,কিন্তু মহিব বরাবরই অন্যরকমের,
তার চিন্তা ভাবনাও উন্নত মানের,তার ধারণা – যেসব ছেলে মেয়েরা গ্রামে পড়াশোনা করে, দক্ষ শিক্ষকের অভাবে তারা বেশিরভাগই ঝরে পড়ে,
তাই মহিব গ্রামের এই স্কুলের দায়িত্ব নিতে চায়।
এই গ্রামের নাম কুঞ্জমতি,গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সন্ধ্যানদী,
গ্রামের নামটা বেশ সুন্দর হলেও, আধুনিকায়নে পিছিয়ে আছে বেশ,
আয়তনে বেশ বড় হওয়া স্বত্বেও, এই গ্রামে একটাই প্রাইমারি স্কুল,একটা মাত্র হাইস্কুল,
অবশ্য দু চারটে মক্তবও রয়েছে,যেখানে ভোর হলেই ছেলেমেয়েরা ছুটে যায় আমসিপারা শিখতে,
এখনো ইলেকট্রিসিটি পৌঁছায়নি এই গায়ে, কাঁচা মাটির রাস্তা,
দীর্ঘদিন বৃষ্টির ফলে কর্দমাক্ত হয়ে আছে, পা দিলেই আটকে থাকে কাঁদায়,
মাঝিকে টাকা দিয়ে পাড়ে উঠে আসে মহিব, এই প্রথম বার গ্রামে এসেছে সে,তাও রাতের বেলা,
আমজাদ ব্যাপারির বাড়ির ঠিকানা যদিও পকেটেই আছে,তবুও একটু ইতস্তত বোধ করছে,খুঁজে পাবে তো শেষ অবধি?
আমজাদ ব্যাপারি হলেন এই গ্রামের একজন নামকরা মানুষ, অর্থের দিক দিয়ে তেমন প্রভাবশালী না হলেও, গন্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় তিনি বহুল পরিচিত।
এইতো বছর তিনেক আগে তিনি রিটায়ার করলেন,বহুদিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি,
বয়সের ভারে যদিও এখন নুয়ে পড়েছেন অনেকটা,কিন্তু তার সম্মানের জায়গাটা ধরে রেখেছেন আগের মতোই,
তিনি যেহেতু এই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন,সেই সুবাদে তার বাড়িডেই থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে মহিবের।
মহিব একা একা যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেও সাহস পাচ্ছিলো না,তাই মাঝিকে ডাকলো অবশেষে,
আংকেল একটু শুনবেন?
মাঝি একটু অবাকই হলো, তবুও বললো,কন সাহেব,
আংকেল, আসলে আমি শহরে থাকি,এই প্রথম বার গ্রামে এসেছি,
এই গ্রামের আমজাদ ব্যাপারির বাড়িতে যাবো,আমিতো ঠিক রাস্তাটা খুজে পাচ্ছি না,আপনি যদি একটু আমায়…
বাকিটা আর বলতে হলো না মহিবের,মাঝি মতিন মিয়া তড়িঘড়ি করে উঠে এলেন নৌকা থেকে,
আরে সাহেব আফনে আগে কইবেন না? আপনি আমজাদ মাস্টারের বাড়িত যাইবেন,এই কাছেই ওনার বাড়ি,লন আমিই আফনেরে পৌঁছাই দিয়ে আসি,
মহিব, এবারে একটু সাহস পেলো,যাক অন্তত কেউ তো আছে সাথে,
খেয়ারপাড় থেকে আমজাদ ব্যাপারির বাড়ি মাত্র পনেরো মিনিটের পথ,
বাড়ির সামনে এসে মতিন মিয়া বললো,সাহেব এই যে এই বাড়িটাই, আফনে এহন যান।
রাইত মেলা হইছে,আমিও বাড়িত যামু, আফনের চাচি চিন্তা করতাছে,
জ্বী চাচা,বিনয়ের সঙ্গে মাঝিকে বিদায় দিলো মহিব।
2
দরজায় ঠকঠক শব্দ হচ্ছে, ধরফরিয়ে উঠলেন মর্জিনা খাতুন,আচমকা ঘুম ভেঙে বেশ হাঁপাচ্ছে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে দরজার দিকে কান পাতলেন,আবারও সেই শব্দ, ঠকঠক।
ক্যাডা দরজা ধাক্কাইতাছে? এত রাইতে ক্যাডা আইলো বাড়িত?
বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠ মর্জিনার,
মহিব প্রথমে বুঝতে পারলো না,তার কি করা উচিত, পরক্ষণেই ভাবলো, যা হয় হবে,বাইরে তো আর রাত কাটানো যাবে না এভাবে।
তাই সে শব্দ করে ডাকলো,আমজাদ আংকেল বাড়িতে আছেন?
আমি ওনার কাছে এসেছি,
ক্যাডা আফনে,নাম কন,
আমি মহিব,শহর থেকে এসেছি, মীর্জা রফিক সাহেব আমার বাবা,
অমনি তড়িঘড়ি করে দরজা খুললেন মর্জিনা,
আরেহ,সাহেব আফনে? আগে কইলেই তো হইতো,ইসসিরে,একবারে ভিজ্জা কাকের লাহান হইয়া গেছেন,আহেন আহেন,ভেতরে আহেন।
জ্বী আন্টি, আংকেল বাসায় নাই?
হ – বাড়িতেই আছে, একখান কামে গেছে, আইয়া পড়বো কিছুক্ষণেই,
আফনে এই ভেজা জামাকাপড় ছাইড়া গরম কাপড় পড়েন,শাওন মাসের বৃষ্টির পানি বহুত ঠান্ডা, জ্বর লাইগ্যা যাইবো,আমি আফনের লাইগ্যা খাওন বাড়তাছি,
মর্জিনা খাতুন এর এমন আন্তরিকতায় বেশ মুগ্ধ হলো মহিব,
আসলে গ্রামের মানুষতো,অনেকটাই সহজ সরল হয়তো,
আমজাদ ব্যাপারি ঘরে ঢুকেই দেখলেন মহিব খাবার খাচ্ছে, তিনি অনেকটা খুশি মনেই মহিবকে জিজ্ঞেস করলেন,বাবা আইছেন কহন? আইতে কুনো কষ্ট হয়নাই তো?
মহিব সহাস্যে বলে উঠলো,জ্বী না আংকেল, তেমন কোনো কষ্ট তো হয়নি, তবে আপনার বাড়িটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না,মাঝি কাকায় হেল্প করলো, না হলে বেশ কষ্ট হইতো বোধহয়!
যাউগগা- শ্যাষ পর্যন্ত আইতে তো পারছেন,এইডাই শুকরিয়া, আমি অবশ্য চিন্তায় আছিলাম বেশ,
যাউক,এহন খাইয়া রেস্ট লন,বহুত জায়গা জার্ণি কইরা আইছেন, রেস্ট লইলে ভালা লাগবো শরীলডা,
আমজাদ ব্যাপারির মতো একজন মুরুব্বির মুখে আপনে শুনে কেমন ইতস্তত বোধ করলো মহিব! শহরে বড় হলেও ছোটবেলা থেকেই মহিব ছিলো বড্ড বিনয়ী, ছোটকে স্নেহ আর বড়কে সম্মান করতে ওর দ্বিধা নেই, তাই বিনয়ের সঙ্গেই আমজাদ সাহেব আর মর্জিনা খাতুনকে ডেকে বললো,আংকেল আন্টি, আপনারা আমার বাবা মার মতোন, আপনাদেরকে আমি ওই চোখেই দেখবো,আশাকরি আপনেরাও আমাকে ছেলের মতোন করেই ভালোবাসবেন, আমাকে তুমি করে বললেই আমি খুশি হবো,
মহিবের এমন বিনয়ী আচরণে দুইজনই বেশ আবেগে আপ্লূত হয়ে গেলেন,আজকালকার যুগে এমন ছেলেও আছে?
ওনাদের দুইটা মেয়ে, কোনো ছেলে নেই,এই মুহুর্তে দাড়িয়ে মহিবকেই মনে হলো নিজেদের ছেলে,
তা বেশ বেশ, আমাগোরও আপত্তি নেই,তুমিতো আমাগো পোলার মতোনই,হেসে বললে আমজাদ ব্যাপারি!
মহিবকে থাকতে দেওয়া হলো ঘরের দক্ষিণ পাশে নতুন তোলা কাছারি ঘরে,
ঘরে গিয়ে মহিব অনেকটা খুশিই হলো, গ্রাম হলেও ঘরের পরিবেশ বেশ ছিমছাম, প্রায় অনেকটা তার রুমটার মতোই,
মহিব তেমন আসবাব পত্র পছন্দ করেনা,ওর পছন্দ খোলামেলা ঘর,তাই যেমনটা চেয়েছিলো তেমনটাই আছে এখানে,
দুই কামরার ঘর, একপাশে খাট বিছানো,একটা ছোট্ট আলনা আছে, আরেকপাশে রয়েছে পড়ার জন্য একটা টেবিল – দুইটা চেয়ার আর মাঝারি ধরনের সুন্দর একটা বুকশেলফ!
বুকশেলফটা দেখে মহিব অনেকটা খুশি হলো,ওর বইগুলো ওর ভীষণই প্রিয়, তাই নিশ্চিন্তে শেলফে এগুলো রাখা যাবে,
রাত প্রায় দেড়টা বেজে গেলো ঘুমাতে ঘুমাতে! নিয়মিত নামাজ আদায় করে মহিব,তাই রোজ অভ্যাসমতো ঘুম ভেঙে গেলো ফজরের সময়টাতে,
কিন্তু তখনো আজান পড়েনি,পরক্ষণেই কানে ভেসে উঠলো ” আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” তরিঘরি করে ঘুম থেকে উঠলো মহিব, বাড়ি থেকে একটু দূরেই মসজিদ,
আজান শুনে সে বের হলো ঘর থেকে, পুকুর থেকে ওযু করে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো মসজিদের উদ্দেশ্যে, ঠিকঠাক মতোন নামাজ আদায় করে ফিরে আসছিলো মহিব, রাতে ভালো ঘুম হয়নি,তাই ভাবলো তাড়াতাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে সে,
কিন্তু কে জানতো? তার ঘুম পালাবে এক নিমিষেই পুকুরের ধারে চোখ পড়তেই,
মহিব দেখলো, সাদা ওড়না মাথায় দেওয়া এক তরুনি হেঁটে বেড়াচ্ছে পুকুর পাড়ে, মুখটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না, তবে- যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা বোধহয় ভীষণ মায়াবী, ভীষণ!
আনমনে মহিব বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, ” একটা তোমার মতোন সকাল দেখার আশায়,
আমি কিরণ দেখা কবেই দিলাম বাদ,
তুমি তাকিও না ওই সর্বনাশী চোখে,
মেয়ে থাকবে না আর বেঁচে থাকার স্বাদ”!
৩.
সকাল সকাল ঘাটে গেছিলো লিয়ানা, হটাৎ ফিরে তাকাতেই মহিবকে দেখলো, যেনো চাতকের মতোন চেয়ে আছে মহিব ওর দিকে,
ছেলেটাকে বেশ ভালোই লাগলো, গ্রামের ছেলেদের মতোন অগোছালো নয়,বেশ হ্যান্ডসাম দেখতে,
এই বর্ষার দিনে এত সকালে ছেলেটাকে দেখে বেশ অবাকই হলো লিয়ানা,মনে মনে ভাবলো কে এই ছেলে, তাদের বাড়ির মধ্যে এভাবে দাড়িয়ে আছে,কোনো কথাও বলছে না,ব্যাপার কি?
কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করতে যাবে কিছু একটা,তখনই ভেতর থেকে মর্জিনা খাতুন হাঁক পাড়লেন, কই গো লিয়ানা, কুনসুমে গেলি পুকুরতন পানি আনতে?
মায়ের ডাকে আর জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেলোনা কিছু, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলো ভেতরে,
মহিব হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষন দাড়িয়ে থাকলো লিয়ানার চলে যাওয়ার দিকে,
মনে হলো যেনো কোনো দূরন্ত কিশোরী মায়ের ভয়ে ছুটে চলে গেলো তার সামনে দিয়ে,
অথচ, তার চলে যাওয়ার রেশ থেকে গেলো অনেকক্ষণ,
আমজাদ সাহেবও ফিরছিলেন নামাজ পড়ে,মহিবকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তিনিও বেশ অবাক হলেন,
কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার বাবা,এত সকালে ঘুম ভেঙে গেলো?
মহিবের ভাবনায় বাঁধা পড়লো, স্বাভাবিক হয়ে বললো,জ্বী আংকেল,নামাজ পড়তে গেছিলাম,
ওও আচ্ছা আচ্ছা, নামাজ পড়ার কথা শুনে আমজাদ সাহেব বেশ খুশি হলেন,ওনার মনটা ভরে গেলো,,
অনেক কিছু বলতে চাইলেন মহিবকে, কিন্তু সেসব কিছুই না বলে মুখে কেবল বললেন,
তা বেশ বেশ,চলো ভেতরে যাই, তোমার চাচি নাস্তা দিতাছে,নাস্তা খাওয়া হইলে আমরা দুই বাপ পোলায় স্কুলের দিকে যামু,আইজকা তোমার প্রথম ক্লাস, হগলের লগে পরিচিত করাইয়া দিমু,
জ্বী আংকেল, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো মহিব।




বাহ্