নন্দপুর গ্রামের মানুষের ঝালমুখো ভাব এমনই যে চায়ের দোকানে ঝগড়া করতে গিয়েও তারা মিষ্টি চা খেতে ভুলে যায়। সেখানে রমনী কাকা একদিন ঘোষণা দিলেন, “আমার খেতের মরিচ কিন্তু মিষ্টি!”
এই কথা শুনে গ্রামের লোক হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। লাঠি হাতে শশধর কাকা বললেন, “রমনী! মরিচ মিষ্টি হলে তো বাঁশ দিয়ে মিছরি বানানো যাবে। তোর কল্পনা শক্তি দেখে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে!” চায়ের কাপে ঝড় উঠল। আর রমনী কাকা এক গাল হেসে বললেন, “হাসো, হাসো! কাল দেখবে, আমার মিষ্টি মরিচ দেশময় নাম করবে।”
রমনী কাকার মরিচ খেতে সত্যিই মিষ্টি। প্রথম চেখেছিলেন ধীরেন পণ্ডিত। তিনি বললেন, “এই মরিচে ঝাল নেই, কিন্তু খেতে এমন মজার যে মনে হয় সোজা স্বর্গ থেকে এসেছে।” গ্রামের আরও কিছু বোকাসোকা মানুষ এই কথা শুনে মরিচের পেছনে লাইন ধরল। তারা ভাবল, “স্বর্গ থেকে এসেছে মানে নিশ্চয় কোনো দেবতার আশীর্বাদ আছে!”
রমনী কাকা এবার সুযোগ বুঝে মরিচের দাম দ্বিগুণ করলেন। বললেন, “এই মরিচ খেলে শরীরে ঠান্ডা পড়ে, মাথা পরিষ্কার হয় আর মন শান্ত থাকে।” লোকজন কথাটা এমনভাবে বিশ্বাস করল যেন রমনী কাকা মরিচ নয়, সঞ্জীবনী বটিকা বিক্রি করছেন।
গ্রামে গুজব ছড়াতে সময় লাগে না। কেউ বলল, “এই মরিচ খেলে জ্বর কমে!” কেউ বলল, “এই মরিচ দিয়ে রান্না করলে শ্বশুরবাড়ির ঝগড়া বন্ধ হয়ে যায়।” এমনকি এক মহিলার দাবি, এই মরিচের গন্ধেই নাকি তার খুঁতখুঁতে শ্বশুরের সর্দি সারিয়ে দিয়েছে।
শহরের লোকজনও খবর পেয়ে ছুটে এলো। এক চিকিৎসক বললেন, “রমনী কাকা, এই মরিচ দিয়ে যদি সিরাপ বানানো যায়, তাহলে তো ডাক্তারি লাইসেন্সের দরকারই থাকবে না!” রমনী কাকা খুব কায়দা করে বললেন, “আমি তো সেবক মাত্র। দেবতারা যা দেন, তা-ই বিক্রি করি।”
তবে সমস্যা হলো, গ্রামে ঈর্ষাকাতর লোকেরও অভাব নেই। খেতরাম কাকা ঠিক করলেন, রমনী কাকার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করবেন। তিনি একদিন রমনী কাকার খেত থেকে মরিচ নিয়ে গিয়ে শহরে পরীক্ষাগারে দিলেন।
কিছুদিন পর রিপোর্ট এলো—রমনী কাকার মরিচ আসলে দেশি মরিচ নয়, বরং বিদেশি মিষ্টি মরিচ। কেউ একবার ভুলে এই বীজ এনে খেতে লাগিয়ে দিয়েছিল, আর সেটাই রমনী কাকা আবিষ্কার বলে চালাচ্ছেন।
এই খবর শুনে সবাই রমনী কাকার দিকে ধেয়ে গেল। শশধর কাকা আবার লাঠি নিয়ে এলেন, “তুই আমাদের ঠকালি? বিদেশি মরিচ খাইয়ে বললি এটা স্বর্গীয়?”
রমনী কাকা এবার গম্ভীর মুখে বললেন, “শোনো, মরিচ ঝাল হোক বা মিষ্টি, কথা হচ্ছে—আমি তো খাটছি। আর তোমরা শুধু হাসাহাসি করছ। তোমাদের বুদ্ধি কি খালি ঝাল-ঝাল কথা বলতেই যায়?”
লোকজন একটু থতমত খেয়ে গেল। কেউ বলল, “আচ্ছা, ঠিকই তো, এই মিষ্টি মরিচ দিয়ে রমনী কাকা নাম করেছেন। আর আমরা শুধু ঝাল মরিচে চোখ জ্বালিয়েছি।”
রমনী কাকার ব্যবসা কিন্তু চলতেই থাকল। তার মিষ্টি মরিচ গ্রামের বাইরেও বিখ্যাত হয়ে গেল। আর গ্রামবাসী শিখল, ঝাল দিয়ে ঝগড়া হয়, কিন্তু মিষ্টি দিয়ে মানুষ জয় করা যায়।



