আদিব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। আর পাশে দাঁড়িয়ে সিয়াম কিছুক্ষণ পর পর আফিয়ার দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে।
“এসব কি মি. সিয়াম….? এটা আমার অফিস কোনো বিগ বসের ঘর না।”__(আদিব)
“সরি স্যার। আর কখনো এমন হবে না।…আসলে স্যার আমার কোনো দোষ নেই। সব দোষ এই তেঁতুল গাছের পেত্নীর। কোথা থেকে এসে বাঁদরের মতো লাফ দিয়ে আমার সমানে পড়েছে। আর একটুর জন্য আমার মোবাইলটার নামাজে জানাজা হয় নাই।”____(সিয়াম)
“ও হ্যালো, নিজে চোখের মাথা খেয়ে হাঁটছিলেন। আমারে দোষ দিবেন না একদম। আর এমন চোখ, কান না খুলে ফোনের মাধ্যে ডুব দিয়ে হাঁটলে তো এমন হবেই। ফোনাটা ভাঙলে বেশি ভালো হতো।”___( আফিয়া)
” ইউ…!”____( সিয়াম)
” Can you stop it, please. এটা একটা অফিস। এখানে অনেক মানুষ আছে। আর তোমারা বাচ্চাদের মতো লড়ে যাচ্ছ। By the way… আপনারা এখানে কেনো এসেছেন?” ____(আদিব)
“আপনার ইন্টারভিউ নিতে”____(স্নিগ্ধা)
“সরি?…কোনো ম্যানারলেস মানুষকে আদিব চৌধুরী ইন্টারভিউ দেয় না। So you can go now.”____(আদিব)
“আমারো না কোনো সখ নাই আপনার মতো বড়লোক বাপের বিগরানো ওঁলাদের সাথে কথা বলার। যার মধ্যে কোনো ভদ্রতা নেই।”____(স্নিগ্ধা)
স্নিগ্ধাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে যায় আফিয়া…
“বোন প্লিজ! আর না, থাম এবার। উনি যদি বসকে বলে দেয় তো তোর সাথে আমারো বিদায় ঘণ্টা বাজবে। আল্লাহর নামে একটু চুপ থাক…আমার জন্য।”___( আফিয়া)
স্নিগ্ধা সাংবাদিকতা ভালো লাগার জন্য করলেও আফিয়া করে নিজের পরিবার চালাতে। আফিয়ার বাবা নেই। তার মা আর ছোট বোনকে তাকেই চালাতে হয়। এই চাকরিটা চলে গেলে আফিয়ার পরিবার পথে এসে যাবে। তাই আফিয়ার কথা ভেবে স্নিগ্ধা চুপ করে থাকে।
“স্যার, ওর হয়ে আমি সরি বলছি। সত্যি ও তখন বুঝতে পারে নি। আপনি প্লিজ ইন্টারভিউটা দিন। না হলে আমার চাকরিটা থাকবে না। প্লিজ!____(আফিয়া)
“ওকে! শুধু আপনার জন্য দিলাম। না হয় এমন অভদ্র মানুষের সাথে আমি কথাও বলি না।”____(আদিব)
স্নিগ্ধা কিছু বলতে চাইলে আফিয়া স্নিগ্ধার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। আর ইশারাতে তাকে শান্ত হতে বলে।
“তুই আবার এখানে স্কুটার থামালি। তাও রাতের বেলাতে। যেখানে কেউ দিনের বেলাতেও আসতে ভয় পায়। বোন এবার তো এই রহস্য উন্মোচনের ভূত নিজের মাথা থেকে নামা।”____( আফিয়া)
“রহস্যের জাল তো একদিন আমি খুলবোই। তুই মিলিয়ে নিস। শুধু আমাকে সাহস দেয়ার মতো আর পাশে থাকার মতো একজনকে পেলেই হয়।”____( স্নিগ্ধা)
“সে তখন করিস। আমাকে তোর এই পাগলামোর চক্করে মারিস না। আমার এখনো বিয়ে হয়নি। জামাইর মুখ দেখিনি। এখন চল না হয় এখানেই আমাদের জীবন তরী ডুববে।”_____( আফিয়া)
“যতসব….ভীতুর ডিম।”____( স্নিগ্ধা)
(স্নিগ্ধা মেহেরিন বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। সবার অনেক আদরের। পড়াশোনা শেষ করে সে সাংবাদিকতাকে পেশা আর নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। স্নিগ্ধার বাবা সোহরাব খান একজন ব্যবসায়ী। বাবা-সোহরাব খান, মা-তামান্না বেগম আর দাদি- হালিমা বেগম কে নিয়ে স্নিগ্ধার সুখের পরিবার।)
“কিরে, মা আজকে এত দেরি করে বাড়ি ফিরলি যে? মায়ের তো চিন্তা হয়।”___(তামান্না বেগম)
“এই জন্যই বলি, মেয়েরে এত উড়তে দিয়ো না। মেয়ে মানুষ এতো রাতে করে বাড়ি ফিরে এটা কি কোনো ভালো কথা। লোকে শুনলে কি বলবে?”____( হালিমা বেগম)
“বাবাকে ফোন দিয়ে তো আমি সব বলেছিলাম। আর বুড়ি শোনো এখন জমানা বদলে গেছে। ছেলে মেয়ে সমান অধিকার। এখন আর লোকজন এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না।…মা আমাকে খেতে দেও অনেক ক্ষুধা লাগছে।”___(স্নিগ্ধা)
“কি হয়েছে? আমার মামোনিকে কে কি বলেছে? আর মা, আমার একটা মেয়ে, ওরে আমি নিজের হাতে মানুষ করেছি। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল ও বোঝে। নিশ্চয়ই সে এমন কিছু করবে না যাতে তার বাবার দিকে কেউ আঙ্গুল তুলতে পারে। সেই বিশ্বাস আমার আছে।”____(সোহরাব খান)
“হ…. আমার কথা তো শোন না একদিন বুঝবি।…. আমার কথার তো কোনো দামই নেই এই ঘরে।”___(হালিমা বেগম)
“আচ্ছা মামনি তোমার এতো রাত কেনো হলো? বললে না কার সভা কাবার করতে গিয়ছিলে? “____(সোহরাব খান)
“আর বলো না বাবা একটা অন্ধের ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম। জানো বাবা সকালে ঐ অন্ধটাই আমার স্কুটারকে তার গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল। আর ওর জন্যই দেরি হয়ে যায় আর বস এই এক্সট্রা কাজ ধরিয়ে দেয়।আমার সাথে বেচারা আফিয়াও ফেঁসে যায়।”____(স্নিগ্ধা)
“কি? কার এতো বড় সাহস যে আমার মেয়েকে ব্যথা দিয়েছে? তুমি শুধু নামটা বলো মা আমি দেখতেছি ওরে।”____(সোহরাব খান)
“লাভ নেই বাবা। সে এই শহরের সবথেকে বড় রাজনৈতিক নেতা আব্রাহাম চৌধুরীর একমাত্র ছেলে আদিব চৌধুরী। আর তুমি এই নিয়ে চিন্তা করো না। আমি দেখে নেবো।”____(স্নিগ্ধা)
আদিব নামটা শুনে বিষম খায় সোহরাব খান। জোরে জোরে কাশতে শুরু করে। স্নিগ্ধার মা ডালের বাটি নিয়ে আসছিলেন। আদিবের নাম শুনে তার হাত থেকে বাটি সহ ডাল পরে যায়। আর স্নিগ্ধার দাদি দাঁড়ানো থেকে ধপ করে চেয়ারের উপর বসে পরে। পরিবারের এহেন কান্ডে স্নিগ্ধা হতম্ব হয়ে যায়।
“বাবা, আদিব চৌধুরীর নাম শুনে তোমারা সবাই এমন চমকে কেনো গেলে? তুমি কি চেনো আদিব চৌধুরীকে?”___( স্নিগ্ধা)
” নাহ তো। আমি কিভাবে চিনবো? তুমি বললে না আব্রাহাম চৌধুরীর ছেলে তাই আর কি। তুমি যাও রুমে। একটু রেস্ট নেও।”___(সোহরাব খান)
“এটা হওয়ারই ছিল। তুই যতই বলিস দেখা তো হতোই। এটা যে ভাগ্যের লিখোন। “____( হালিমা বেগম)
“আহ মা, তুমি একটু চুপ করবে। মা স্নিগ্ধা তুমি দাদির কথা মাথায় নিয়ো না। অনেক ক্লান্ত তুমি। যাও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”____(সোহরাব খান)
স্নিগ্ধাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে তাকে জোর করে রুমে পাঠিয়ে দেয় সোহরাব খান। আর স্নিগ্ধাও ভাবে হতেই পারে বড়দের কোন গোপন কথা। তাই হয়তো তাঁরা স্নিগ্ধাকে বলতে চায়না। সে বাধ্য মেয়ের মত নিজের রুমে চলে যায়।
“মা, কি দরকার এসব কথা স্নিগ্ধার সামনে বলার? আমি চাইনা আমার মেয়ে এসব কিছু জানুক। আর ঐ ছেলের জন্য আমি আমার মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পারবোনা। ওর বাবা তো আমার বোনের জীবন শেষ করেই দিয়েছে। আজ ২০ বছর ধরে আমার বোনকে আমি দেখি নি। জানিনা তারা কোথায় আছে? আদৌ বেঁচে আছে কি না? কিন্তু ওরে আমার মেয়ের জীবনে আমি কিছুতেই আসতে দিব না।” ______( সোহরাব খান)
লেখক : মায়েদা জাহান মৌ
ই-মেইল : mayedajahanm@gmail.com



