বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি,
সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়! কথায় বলে ‘আগার জীনা হ্যায় মৌজমে তো নকরী করনা ফৌজমে’। শামীমেরও হেসে খেলে আনন্দে চাকরি দেখতে দেখতে তিন বছর হয়ে গেলো। তবুও মন তার পালাই পালাই করে। ট্রেনিং সেন্টারে বসে একবার পালিয়েও ছিলো ধরা পরে গেলে সে কী ভয়ঙ্কর শাস্তি!
ট্রেনিং শেষ করে এই যে তিন বছরের চাকরি এর মধ্যে সীমান্ত বাহিনীর শৃঙ্খলা আর ভ্রাতৃত্ববোধে শামীম যারপরনাই আপ্লুত, আনন্দিত। নানান দেশের নানান মানুষের সাথে হৈ-হুল্লোর করতে করতে সময় বয়ে যায়। সমবয়সী সব জওয়ানরা ডর্মিটরী আবাসনে থেকে একে অপরের গল্প শুনে শুনে সুখ স্বপ্নে বিভোর থাকে। তবুও শামীম বুঝতে পারে যে সাধারণ মানের সৈনিকদের এখানে হুকুম তামিল করা ব্যতিরেকে অন্য কোন কাজ নেই। স্বাধীন চিন্তা করার সুযোগ নেই, বিশেষ করে সৃজনশীলতা এখানে একেবারেই অচল, এক অর্থে অপরাধ। হুকুম তামিল করো, মাস শেষে বেতন নাও, মৌজ করো -জীবন কাটিয়ে দাও। দেশের কাজ করতে এসেছো তাই করো। দেশ মাতৃকার একজন গর্বিত সৈনিক হও, রাইফেল হাতে ডিউটি করো।
শামীম করছেও তাই। সৈনিকসুলভ আচরণে সে প্রতিনিয়ত অভ্যস্ত হয়ে উঠছে কিন্তু ভাবলেশহীন রোবট হয়ে উঠতে হয়তো আরও সময় লাগবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে তার অভিজ্ঞতা একেবারে কমও হয়নি। নিজে উচ্চ শিক্ষার আশা নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার জন্যে আবেদন করেছিলো, ব্যাটেলিয়ন সুবাদার মেজর খালিদ সাহেব শুনে তো হেসেই খান খান। সন্ধ্যেবেলার রোলকলে সকল সৈনিকদের সামনে ব্যাটেলিয়ন হাবিলদার মেজর মতিনকে ডেকে বলেন-
শুনলাম শামীম নাকি আরও লেহা-পড়া করতে চায়? লেহা পড়া কইর্রা আর কাম কী মতিন?
হাবিলদার মতিন খ্যাক খ্যাক করে হেসে, ঠোঁট উল্টে বলেন-
আইলে বিলে পাশ দিয়া মোনে কয় দেশ উদ্ধার করবে। তারপর শামীমের দরখাস্ত তার হাতে ফেরৎ দিতে দিতে বলেন-
ওসব চিন্তা বাদ দেও শামীম। তারচেয়ে বডার-টডার খাটো, দু’চার পয়সা কামাও যাতে কাজ অয়। আইলে বিলের সাট্টিবিশ এই ডিপারমেন্টে কোন কামে লাগবেনা।
আবেদন পত্রখানা ভাঁজ করে ট্রাঙ্কে রেখে দিয়েছিলো শামীম। আর কখনও লেখাপড়ার কথা কারও কাছে বলেনি।
শামীম বুঝেছে, সে এখন খাঁচার পাখির মত সারাদিন বসে বসে দুনিয়াদারী দেখবে। মানুষের আচরণ, কথাবার্তা শুনবে ফের মানুষের মত কথাও বলবে কিন্তু নিজের ইচ্ছের আকাশটি চিরকাল দিগন্তে থেকে যাবে। তারপর একদিন ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মরে যাবে।
যেহেতু তার আকাশ অবরুদ্ধ তাই তার আকাশ কুসুম চিন্তা করাও অন্যায়, সে এমন এক জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে যেখানে তার কোন স্বাধীনতা নেই, ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু নেই। মেধার চর্চা এখানে সুনজরে দেখা হয়না। যতোই মেধাবী হোক নিম্ন পদবীর সৈনিকরা চার দেয়ালের মাঝে ছটফট করেই মরবে। যখন মুক্তি পাবে তখন জীবন তাকে ছুড়ে ফেলে চলে যাবে বহুদূর। এসব চিন্তা তাকে আকুল করে তোলে।
শামীমের পড়াশোনা করার বড় সখ ছিলো। তার মনের ভেতর ইদানীং ক’য়েকটি প্রশ্ন গুমরে মরে যার উত্তর কেউ জানেনা। স্বাধীন এ দেশটিতে এ কেমন অন্যায়? কেন এই বাহিনীটির জওয়ানদের মেধার কোন মূল্যায়ন হবেনা? কেন তারা অফিসার পদে পদোন্নতি পাবেনা? পড়াশোনার সুযোগ পাবেনা? তাহলে সীমান্তের এই বিপুল সংখ্যক কর্মচারীরা কী একটি স্বাধীন দেশের পরাধীন জনগোষ্ঠি হয়েই বেঁচে থাকবে?
ছোটোবেলা শামীমদের ঘরে ইঁদুরের খুব উপদ্রব ছিলো। তার বাবা তখন বাড়িতে। শামীম বাবার সাথে গৌড়িচন্না হাটে গিয়েছিলো। মা বলেছিলো-
শামীমের বাপ, একটি ইঁদুর মারার কল আইনেন তো?
গৌড়িচন্না বাজার থেকে শামীমরা কাঠের একটি বাকসের মতো কল এনেছিলো।
কলটি একটি ইঁদুর ধরার ফাঁদ। তার ভেতরে স্প্রিংযুক্ত একটি পাতের উপর খাবার রাখা হতো। সে খাবারের লোভে ইঁদুর যখন ভেতরে ঢুকে পড়তো অমনি স্বশব্দে বন্ধ হয়ে যেতো প্রবেশ মুখ। ব্যস ভেতরে ধুঁকে ধুঁকে মরতো ইঁদুর। শামীম তার বোন সোনিয়াকে নিয়ে দেখতো ইঁদুরের দাপাদাপি। তার বড় মায়া হতো। সোনিয়া বয়সে তার ছোট, সে হাততালি দিয়ে বলতো-
কী মজা, কী মজা। তারপর ইঁদুরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতো-
তোর অনেক পাপ হয়েছে। এ্যাহন বোঝোডা কেমন? আমাগো কাপড় কাটছো, ঘরে গর্ত করছো তোরে এহন বাকসো ভইরা পানিতে ডুবাবো। তুই দম বন্ধ হইয়া মরবি।
তারপর সবার অজান্তে শামীম কলটি নিয়ে এক দৌড়ে চলে যেতো বাড়ির দক্ষিণ পাশে কাছেম গাজীর ভিটায়। সেখানে বাকসো খুলে ইঁদুরকে বলতো- শীগগীর পালিয়ে যা। খবরদার ও বাড়িতে আর যাইসনা। তাইলে আর নিস্তার নাই।
আজ ভাবে কোন পাপে তার জীবনটা সেই ফাঁদে আটকে গেলো? বাকসো বন্দী সেই ইঁদুরটির মতো সেও কী অনেক পাপ করেছে?
এসব ভাবতে ভাবতে সে আবার মণ্ডলের মুখের দিকে তাকায়। বলে-
ও চাচা, আপনি নাকি ইনফর্মার ছিলেন?
মেনাজ মণ্ডল নিস্পলক তাকায়। কোন কথা বলেনা।
ফের শামীম বলে- তা ইনফর্মারী ছাইড়া মাল পাচারের কামডা কেমনে শুরু করলেন?
এবারেও মণ্ডল কোন জবাব দেয়না।
শামীম বুঝতে চেষ্টা করে মণ্ডল কী পরিমাণ বিরক্ত হয়েছে, বলে-
বংশীয় লোক আপনি। মণ্ডল বংশের নাম ডাক আছে। সেই বংশের মানুষ অইয়া দেশ বিরোধী কাম করেন, লজ্জা করেনা ?
রাগে মণ্ডলের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে যায়। তার মুখ থেকে ঘোৎ ঘোৎ আওয়াজ বেরুতে থাকে। বলে-
আপনি বাবা সরকারি মানুষ, মন যা চায় কইতে পারেন। তয় সাফ কতা কইয়া দিলাম, এই মেনাজ মণ্ডল চোর অইলেও দেশ বিরোধী কোন কাম করেনা। যুদ্ধের সময় ইনফর্মার আছিলাম, পাকিস্তানিদের লগেও রইছি। তয় খবর কইছি সব মোকাব্বের মাস্টারগোদে। হেরাই তো দেশ স্বাধীন করলো।
শামীম মণ্ডলের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দেখে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর অথচ গভীর চকচকে দু’টো চোখ। সে চোখে জ্বলজ্বল করছে দেশপ্রেমের অহংকার, মুক্তির সোনালী সূর্য। শামীম ভাবে-
আহা মণ্ডলরাও তারমতো পেটের দায়ে কোন এক দিন দু’বস্তা চিনি হয়তো এনেছিলো। সে চিনি নিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিলো সীমান্ত বাহিনীর হাতে। জেলে গিয়েছিলো আর তখন ছাড়িয়ে এনেছিলে এই রাজাকার করম আলী চেয়ারম্যান। সীমান্ত সৈনিকের চাকরি ছেড়ে শামীম যেমন যেতে পাড়ছেনা মণ্ডলও তেমনি এ জীবন ছেড়ে কোথাও আর যেতে পারবে না।
সুসংগঠিত সীমান্ত বাহিনীর মতো সীমান্ত এলাকার অপরাধ জগতেও আছে সুগঠিত স্তর বিন্যাস। মেনাজ মণ্ডলের মাথার উপরে বসে আছেন চেয়ারম্যান, তার উপরে আছেন মন্ত্রী-এমপি, সরকারি আমলাদের মতো বড় বড় রুই কাতলা। রুই কাতলারা জনতার কাতারেই মিশে থাকেন। চোরাই পথে দেশের সর্বস্ব বিকিয়ে দিয়েও তারা দেশপ্রেমিক আর মণ্ডলের মতো ক্ষুধার্ত, দলিত শ্রেণি চিরকালই বলির পাঠা।
চোরা কারবারী মণ্ডলদের বউ-ঝিরাও একই পথের যাত্রী। হয় তারা কুখ্যাত প্রভাবশালী ঐসব গড ফাদারদের নির্দেশে মাল পাচার করবে, নয়তো গতর দেবে। এইসব পরিক্রমার মধ্যেই কাটবে তাদের জীবন। অথবা কোনো একদিন গুলিবিদ্ধ লাশ হয়ে ফেলানী নাম নিয়ে কাঁটাতারের সাথে ঝুলে থাকবে।
নতুন জয়েন করা ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার আক্রাম আলী বীর প্রতিকও বরিশালের মানুষ। কথা-বার্তা, চাল-চলনে যাকে বলে খাডি বরিশাইল্যা। আক্রাম আলী থানা সদরে কী একটা মিটিংএ গেছেন , কখন ফিরবেন তা কারও জানা নেই। আক্রাম আলী খুবই খাতারনাক আর জিদ্দি হাবিলদার হিসেবে পরিচিত।
একজন পরিক্ষীত দেশ প্রেমিক এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় ডিপার্টমেন্টের অফিসার জওয়ান নির্বিশেষে সবাই তাকে সমীহ করেন।বহু স্মাগলারকে নাকি চৌদ্দ শিকের ভাত খাইয়েছেন আক্রাম আলী। পুরো বাহিনীতে তার নাম-ডাক। সে নাম মেনাজ মণ্ডলের মতো ছিঁচকে চোরেরও অজানা নয়।



