চৈত্র মাস। দিনাজপুরের তপ্ত বালুময় জনপদে বইছে লু হাওয়া। ঋতু বৈচিত্রের দেশ হলেও উত্তর বঙ্গের এই বরেন্দ্র অঞ্চলের আবহাওয়া কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে গ্রীষ্মকালে যেমন পুড়ে যাওয়া রোদ, শীতকালে তেমনই রক্ত জমে যাওয়া ঠাণ্ডা। এই রোদে পুড়ে বহুপথ হেঁটে এসে অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মেনাজ মণ্ডলের ছেলে সবুজ। এ পথেই মুক্তিযোদ্ধা মোকাব্বের মাস্টারের মেয়ে বর্ণা আসবে।
বর্ণা যাবে দিনাজপুর কেবিএম কলেজে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেছে সবুজের। চৈত্রের প্রচণ্ড তাপদাহে ঘেমে গেছে সে। বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে প্রসাব করতে বসেই দেখতে পায় দূর থেকে বর্ণা ছাতা মাথায় এগিয়ে আসছে। প্রসাব অসমাপ্ত রেখেই দ্রুত উঠে দাঁড়ায়, রজ্জু পায়ে হেঁটে আসে রাস্তায়।
আজ ছাব্বিশে মার্চ। বর্ণার কলেজে কোন ক্লাশ হবেনা, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কলেজ ক্যাম্পাসে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। আজ সে একটু সেজেগুজেই বের হয়েছে। সাধারণ তাঁতের একখানা সুতি শাড়িতে খুবই সুন্দর লাগছে তাকে। চমৎকার ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে হেঁটে আসছে বর্ণা।
সবুজ কলেজে পড়ে না তবু সে কলেজের সব খোঁজ খবরই রাখে। প্রতি বছরই ছাব্বিশে মার্চে নানান আয়োজনে পালিত হয় দিবসটি। দিনাজপুরের কেবিএম কলেজ বরাবরই গান বাজনা বা খেলাধুলায় একটি নামকরা কলেজ। এ কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মাস্টারের মেয়ে বর্ণা। আজকের নাটকে বর্ণাও পারফর্ম করবে। তাছাড়া অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বটাও তার। বর্ণা তাই দ্রুতপায়েই হেঁটে যাচ্ছিলো কিন্তু রামসাগর পর্যন্ত আসতেই সেই পুরোনো কাহিনী।
তোমার কী লাজ শরম নেই? প্রত্যেকদিন পথে দাঁড়িয়ে থাকো কেন? মন্ডলের ছেলে সবুজকে দেখে খেঁকিয়ে ওঠে বর্ণা।
অনেকটা গোবেচারা টাইপের চেহারা সবুজের, তবে বলিষ্ট গড়নের এ যুবক সুদর্শন আর সুপুরুষও। তাকে দেখলে সে যে মণ্ডলের ছেলে একথা কেউ বলবেনা। মায়ের মত সুশ্রী আর সুগঠিত শারিরীক অবয়ব তাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
বর্ণার কথায় সবুজ মিষ্টি করে হাসে, বলে-
পুরুষ মাইনসের লাজ-লজ্জা কী? আমগো করম চেয়ারম্যান কইছে- পুরুষের লজ্জা-শরম-ভয় এই তিন থাকতে নয়। তারপর চেহারায় ক্ষাণিকটা গাম্ভীর্য টেনে বলে-
কলেজে যাও বুঝি? তোমার লগে দু’হান কতা কইতাম বর্ণা?
বর্ণা কিছুক্ষণ সবুজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর মুখ ভেংচিয়ে বলে-
না_আ আমনের লগে আমার কো_নো কতা নাই। তারপর একটু থেমে সবুজের চোখে চোখ রেখে শাসনের সুরে বলে-
এ্যাই, তোমার চোখ অমন লাল দেখায় ক্যান? রাইতে ঘুমাও নাই বুঝি? সারারাত গরু পাচার করছো? নাকি গাঁজা টাজা খাইছো?
বর্ণা আর সবুজদের বাড়ি পাশাপাশি। শিশু বয়স থেকে পরস্পর খেলাধুলা করেই বড় হয়েছে। তবে সামাজিকভাবে দুই পরিবারের মধ্যে রয়েছে দুস্তর ব্যবধান। সবুজের বাবা মেনাজ মণ্ডল ছিঁচকে চোরা কারবারী। সে ইন্ডিয়া থেকে নানান জিনিসপাতি চোরাই পথে এনে তা স্থানীয় স্মাগলারদের কাছে বিক্রি করে। দু’একবার জেলও খেটেছে । মেনাজ মণ্ডলের বয়স হয়েছে, কাজ-কর্ম আগের মতো আর পারে না। বর্তমানে তার সাথে যোগ দিয়েছে তারই একমাত্র ছেলে সবুজ। চিনি, জিরা, এলাচ ইত্যাদি নানান পদের মশলা-পাতি ওপাড় থেকে এনে বিক্রি করে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ইন্ডিয়ান শাড়ির। ইদানীং গরুও আনছে। গরুপ্রতি সবুজ পায় পঞ্চাশ টাকা। কাজ বেশি কিছুনা, এনায়েতপুর আর খানপুর সীমান্ত ফাড়ির মধ্যিখান দিয়ে গরু এনে মাত্র দু’কিলোমিটার জায়গা পার করে দেয়া। খানপুর রাস্তায় করম চেয়ারম্যানের লোকেদের ট্রাক রেডি করাই থাকে। ট্রাক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলেই কড়কড়ে নোট। একেবারে টাটকা পয়সা।
কাজটিতে রিস্ক আছে যেকোন মুহুর্তে ধরা পড়ার সম্ভাবনাও আছে। আর সীমান্তবাহিনীর হাতে একবার ধরা পড়লে কম হলেও পাঁচ হাজার টাকা নগদ। নইলে জেলের ভাতে কোনো মাফ নেই। এসব কাজ অবশ্য সবুজের ভালো লাগেনা।
ছিঁচকে চোরাকারবারীর ঘরে জন্ম নিলেও সবুজ কিছুটা ভিন্ন স্বভাবের মানুষ। উদাসীন প্রকৃতির এই ছেলেটি দেখতে শুনতে যেমন সুপুরুষ, তেমনি সুঠাম দেহের অধিকারী। তবে প্রাইমারী স্কুলের পর তার আর লেখাপড়া হয়নি।
বাড়ির কাছের প্রাথমিকে একই সাথে একই ক্লাশে পড়তো বর্ণা আর সবুজ। ভালো ছাত্র দু’জনই। সবুজের গানের গলাও বটে। স্কুলে এমন কোন অনুষ্ঠান যায়নি যাতে গান করে সবুজ ফার্স্ট হয়নি। এখনও গান-বাজনায়ই সময় কাটে তার। নেহায়েত পেটের দায়ে চোর। অন্য কিছু করার চেষ্টা আছে কিন্তু করম চেয়ারম্যানের কথার উল্টা যাবার সাধ্য কী সবুজের আছে? তার বাবা মেনাজ মন্ডলেরও সে ক্ষমতা ছিলো না। মেনাজ মন্ডল তিন তিনবার জেল খেটেছে। বিডিআরের হাতে মার খেয়েছে বহুবার। শরীর নেহায়েত অসুস্থ তবু করম চেয়ারম্যানের শ্যেন দৃষ্টি থেকে এলাকার এই সব ভুমিহীন, প্রান্তিক মানুষগুলোর বাঁচার উপায় নেই। সে যাই হোক। সেই কুখ্যাত ছেচরা চোরা কারবারীর পোলা সবুজ কীনা প্রেম নিবেদন করতে চায় মুক্তিযোদ্ধা মোকাব্বের মাস্টারের মেয়ে বর্ণাকে! বর্ণার কণ্ঠে আবারও উষ্মা, বলে-
লাজ শরম তো নাই, কাম করো ছেচরা চোরা চালানীর। তাগো লগে গাঁজা টানো, এর মধ্যে চাঁন ধরার আশাও করো নাকি ?
অপমান বোধ করে সবুজ। সত্যিই তো বামুন হয়ে কী চাঁদ ধরা যায়? মনে মনে বলে ঠিকই তো, স্মাগলাররা আবার প্রেম করবে ক্যা? হেরাতো মানুষ না! একেবারে চুপসে যায় সবুজ, মুখে কোন রা করেনা তবে অদ্ভুত সুন্দর দুটো চোখ তুলে অসহায়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বর্ণার মুখের দিকে।
করম চেয়ারম্যান এই নিয়ে তিনবার নির্বাচিত। বর্ণার বাবার সাথে তার বিরোধটা বলতে গেলে জন্ম থেকেই। বর্ণার বাবা মোকাব্বের মাস্টার বীর মুক্তিযোদ্ধা, আদর্শবাদী মানুষ। কম্যুনিস্ট রাজনীতি করেন, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দিনাজপুর শহর হেঁটে বেরান। চাকরি থেকে রিটায়ারের পর এখন একটি পত্রিকা চালান। কখনও হয়তো দেখা যাবে প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয় কোন ইস্যুতে একটি ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। কখনও রিকশার হুডের সাথে মাইকের হর্ন ফিট করে কোন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছেন। বক্তৃতার শ্রোতা নেই, মানব বন্ধনে লোক নেই কিন্তু তাতে কী? মোকাব্বের মাস্টারের নীতি আর আদর্শকে ভয় পায়না এমন মানুষ গোটা দিনাজপুরে নেই।
এই মোকাব্বের মাস্টার নির্বাচন এলে বরাবরই করমের বিপক্ষ করবেন, বিরোধটা এখানেই। মাস্টার বিরোধ করবেন ঠিকই আর ভোটের সময়ে করমের বিপক্ষে গণ জোয়ারও থাকবে কিন্তু তবুও ভোটের বেলা কেমনে যেনো করমই হয়ে যান।
একটা স্মাগলার ছল-ছাতুরী করো নির্বাচনে জিতবেন এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কিন্তু মাস্টার বিস্মিত হন যে মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত যখন এই কারবারীর পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। গেলো বছর মোকাব্বের মাস্টার ইন্তেকাল করেছেন। সেসময় করম চেয়ারম্যান এসেছিলেন তাদের বাড়ি। কেঁদেছেনও সবার সামনে। কিন্তু বর্ণা জানে এ কান্না একেবারেই কুমিরের কান্না।
সবুজের প্রতি নয়, বর্ণার ঘৃণা তাই কেবলমাত্র করম চেয়ারম্যানের উপর আর সবুজ সেই করম আলীর হয়ে কাজ করে বিধায় তার রাগটা সবুজের উপরই ঝাড়ে। কিন্তু সবুজের নিরুত্তর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন মায়া হয় বর্ণার। সে অনেকটা অনুশোচনার অনলে পুড়তে থাকে তবে মুখে কিছু বলে না।
ফের সবুজ মুখ তুলে বর্ণার চোখে তাকায়। বলে-
রিকশা করে দেই?
লাগবেনা, আমিই করে নিতে পারবো। সবুজ আর কথা খুঁজে পায়না। বর্ণা কিছুটা হেঁয়ালী করে বলে-
কীগো সবুজ ভাই, দু’হান কতা তো শেষ অইয়া গেলো? আমিতো এহন যাইতে পারি, কী কও?
সবুজ কিছু বলেনা, শুধু নীরব চোখে তাকিয়ে থাকে বর্ণার অদ্ভুত সুন্দর, মায়াবী দু’টি চোখের দিকে। সে জানে বর্ণার ঐ চোখে সবুজের জন্যে শাসন আছে, প্রশ্রয় আছে, মমতা আছে।
বর্ণাও আর কিছু বলেনা, সবুজের চোখে তাকিয়ে সম্মোহিতের মতো ধীরে ধীরে হেঁটে যায়। কিছুটা পথ হেঁটে রামসাগর থেকে একটা রিকশা পেয়ে যায় বর্ণা, চলে যায় কলেজের দিকে।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৪) | আনোয়ার হোসেন বাদল
2 কমেন্টস




চমৎকার
অসাধারণ