সীমান্ত ফাঁড়িতে নতুন কোনো কমান্ডার বদলী হয়ে এলেই একটি মিটিং হবে। তাতে অংশ নিবে স্মাগলার, ইনফরমার, স্থানীয় প্রশাসনসহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। এটি মূলতঃ একটি রুটিন ওয়ার্ক, তা আগত কমান্ডার সৎই হোক আর অসৎই হোক।
হাবিলদার আক্রাম আলীর কথা অবশ্য ভিন্ন। গোটা ডিপার্টমেন্টে তার নাম আছে। তার মিটিং মানে মিটিং। গোটা স্মাগলিং জগৎ হাবিলদার আক্রামের ভয়ে অস্থির। ভয় করে তার নীতি আদর্শকে। ডিপার্টমেন্টের উর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিরা পর্যন্ত আক্রামের নীতি আদর্শকে সম্মান করেন। সেই আক্রামের চোরাচালান সংক্রান্ত মিটিংএ মেনাজ মণ্ডল অনুপস্থিত!
এমন নয় যে মেনাজ মণ্ডল মিটিংএর খবর জানতো না। মিটিংএর খবর মেনাজ ঠিকই পেয়েছিলো কিন্তু তখন সে চেয়ারম্যানের নির্বাচনী পোস্টার লাগানোর কাজে ব্যস্ত। মেনাজের দায়িত্ব ছিলো পুরো নির্বাচনী এলাকায় মাত্র দু’দিনের মধ্যেই পোস্টার লাগানোর কাজ শেষ করা। অথচ সে তিনদিনেও তা শেষ করতে পারেনি। চেয়ারম্যান রাগ করতে পারে ভেবে সে রাতেও লাগিয়েছে।
সুতরাং, তৃতীয় দিনেও পোস্টার লাগানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় ক্যাম্পের মিটিংএ আর যেতে পারেনি মেনাজ মণ্ডল । আসলে একটা দোটানায় পড়ে গিয়েছিলো সে। চেয়ারম্যানের কাজও ফেলতে পারেনা আবার ক্যাম্পে মিটিংএ থাকাটাও জরুরী। শেষে ছমিরদ্দিকে দেখে ক্ষাণিকটা সাহস হয় তার। ছমিরদ্দিনের বুদ্ধসুদ্ধি পাকা। বয়সও হয়েছে। দীর্ঘ জীবন চোরাচালানের সাথে জড়িত। বলেছিলো-
বুইজলা মণ্ডল গরীবের অইলো উভয় সংকট। রামের করাতের মতো আইতেও কাটে, যাইতেও কাটে। তয় সোজা কতাডা হোনো- চেয়ারম্যানের অবাধ্য অইওনা তাইলে কিন্তু খবর আছে।
ক্যাম্পের যেখানটায় মেনাজ মণ্ডল বসে আছে সেখানে যদিও গাছের ছায়া তবু গরমে ঘেমে গেছে মণ্ডল। তার কাছে ঘড়ি নাই, সে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বেলা আন্দাজ করার চেষ্টা করে। আজ তার কাছে মনে হয় অনন্তকালেও যেন দিনটি ফুরাবেনা। বারোটা, একটা বোধহয় বেজে গেছে। ক্ষুধায় তার পেট চো চো করছে। কিন্তু তার কাছে কেউ আসছেও না, তাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসও করছেনা।
প্রহরী শামীমের উদ্দেশ্যে মুখ উঁচু করে মেনাজ, বলে-
কয়টা বাজে বাবা?
শামীম তার দিকেই তাকিয়েছিলো, বললো-
প্রায় বারোটা।
মণ্ডল মনে মনে ভাবে- নিশ্চয়ই তার স্ত্রী সুফিয়া এতোক্ষণে খবর পেয়ে গেছে আর খবর পাওয়া মানে চেয়ারম্যান তাকে যেকোনো উপায়ে হোক ছাড়িয়ে নিবেই। সে কেবলই পশ্চিম দিকে চেয়ারম্যানের আসার পথের দিকে তাকায়। হতাশ হয়ে ভাবে কুদ্দুস কোন কারসাজি করেনিতো? ইনফরমার কুদ্দুসকে মণ্ডল একদম সহ্য করতে পারেনা। একটা লোক যে কী না ইনফর্মার হিসেবে কাজ করে ক্যাম্পে অথচ গোলামী করে করম চেয়ারম্যানের। সে নিজেও একসময়ে ইনফরমারী করেছে কিন্তু ভুলেও বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।
প্রহরীর ডিউটি বদলের সময় হয়েছে। মেনাজের জন্যে তার মন কেমন করে ওঠে। অনেকদিন হয় বাড়ি থেকে এসেছে, আহা বাবার মুখখানা মনে পড়ে সিপাহী শামীমের। বাবা যখন শেষবারের মতো জাহাজে যান তখন শামীমের জন্যে একটি সাইকেল আর সোনিয়ার জন্যে কানের দুল বানিয়ে দিয়েছিলো। বাবা বলেছিলেন-
আসছে বছর শামীমকে ঢাকায় বা চট্টগ্রামে একটি বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে আসবে। বাবার আর ফেরা হয়নি। মেনাজ মণ্ডলকে দেখতে দেখতে সহসা মণ্ডলের মুখে শামীমের বাবার মুখটা ধরা পড়ে। শামীম বলে-
ও চাচা, আসছেনতো সেই সকালবেলা। তা খেয়ে টেয়ে আসছেন তো?
মেনাজ কোনো কথা বলেনা। তার কথা না বলা আধো বদনে বসে থাকা শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে যা বুঝার বুঝে ফেলে শামীম। সে ডিউটি শেষ করে নিজের জন্যে রাখা খাবার আর পানি নিয়ে আসে মেনাজের জন্যে। বলে-
খেয়ে নিন, চাচা। আগেতো পরাণ! তার কথায় মেনাজের চোখে পানি চিকচিক করে ওঠে।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে শামীম তাড়া দেয়, বলে-
খেয়ে নিন চাচা। লজ্জা করবেন না আর আমিতো আপনার ছেলের মতোই। এবার সত্যিই কেঁদে ফেলে দাগি স্মাগলার মেনাজ মণ্ডল।
মণ্ডল সব্জি আর রুই মাছ দিয়ে ভাতের গ্রাস তুলছে আর শামীমকে জিজ্ঞেস করছে আপনি খাইছেন তো বাবাজী?
শামীম কোন জবাব দেয়না, তার মনোজগতে এ মুহুর্তে তার পিতার মুখচ্ছবি ভেসে বেড়ায়। বরগুনার কাছিপাড়া গ্রামের একটি নিভৃত পল্লীতে শামীম তার বাবার কোলে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। শামীম বলছে আর খাবেনা অথচ বাবা বলছে আর দুই নেলা বাবা?
শামীম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-
আমার খাবার আছে, আপনি খেয়ে নিন চাচা।
সহসাই আক্রাম কমান্ডার ক্যাম্পে ঢুকতে ঢুকতে শামীমকে বলে-
কী অইছেরে শামীম? শেষ কালে নিজের খাবারডাই দিয়া দেলা নাহি? আক্রাম আলী খুব কড়া কিছিমের মানুষ তবে জওয়ানদের সুযোগ সুবিধার জন্যে একেবারে দিল দরিয়া। ভালো লাগে শামীমের। কথায় বলে কড়া স্বামীর অধীনে সংসার আর কড়া কমান্ডারের আন্ডারে চাকরির মজাটাই আলাদা। কমান্ডার ফের বলেন-
যাও, মেসে গোনে আমার খাবারডা নিয়া আও, দুইজোনে ভাগ কইরা খাই। আরে ব্যাডা, খাইয়া লইয়া কামাই, ঝি বাঁচলে জামাই। কী কও মণ্ডল? বলেই হা হা করে হেসে ওঠে হাবিলদার আক্রাম আলী।
মেনাজ কী জবাব দিবে বুঝে উঠতে পারে না। সে হাতের খাবার মুখের কাছে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শামীমের মুখের দিকে।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-১০) | আনোয়ার হোসেন বাদল
2 কমেন্টস




Lodibet291 is a good choice if you enjoy online gambling, I find it very entertaining and easy to access. You want to try? Visit lodibet291
Finally found a reliable link that actually works without any lag. Getting into my favorite games is so much easier now with jili0gameslogin.