কলেজের অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত দশটা বেজে যায়। এতোরাত অব্দি কলেজে কোন প্রোগ্রাম থাকলে বর্ণা সাধারণত শহরে তার মামাদের বাসায় থেকে যায়। আজ অবশ্য সবুজ আছে, তাছাড়া চৈত্রের এ রাতে আকাশেও ভরা জোৎস্না। সবুজ যদিও করম চেয়ারম্যানের চাতালে যাবে তবে বর্ণাকে পৌঁছে দিতে অমত করবেনা।
অনুষ্ঠান শেষে বর্ণা তাই সবুজকে ডেকে বলে-
মায়ের জ্বর দেখে এসেছি। বাড়ি যাওয়া দরকার। আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?
সবুজ কিছু বলেনা। মনে মনে ভাবে এতোরাতে বর্ণার সাথে গেলে কেউ কিছু বলবে নাতো!
মূলতঃ সামাজিক বা অার্থিক বৈষম্য থাকলেও প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ মোকাব্বের মাস্টারের কাছে মণ্ডল যেমন আপনজনের মতো, তার মেয়ে বর্ণাও ছোটবেলা থেকে সবুজকে তেমনি আপনজনই ভেবে এসেছে।
সবুজের সাথে এর আগেও বহুবার রিকশায় চড়েছে বর্ণা কিন্তু আজকের এই রিকশা যাত্রা তার কাছে অন্যরকম মনে হচ্ছে। সবুজ যেন আজ অন্য কেউ, সবুজও নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখেই বসে ছিলো। বর্ণার শরীরে যাতে শরীর না লাগে তার জন্যে সদা সতর্ক রয়েছে সবুজ।
তবুও পুলহাটা চাতাল পল্লী পার হয়ে যেতে যেতে অঘটনটা ঘটেই গেলো। দু’জনে রিকশায় বসে আছে হঠাৎ বাঁক ঘুরতে গিয়ে রিকশা থেকে পড়ে যায় বর্ণা আর বর্ণাকে টেনে তুলতে গিয়েই বিপত্তিটা ঘটে। বর্ণার বুকের সাথে একেবারে লেপ্টে যায় সবুজ।
কয়েক বছর আগেও একবার তারা পরস্পর স্পর্শ সুখ নিয়েছিলো তা ছিলো সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিতে মোকাব্বের মাস্টারের ছন ভিটায় পালানোর সময় কিন্তু আজ? আজ সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় আর অসতর্কতায় মুহুর্তে কী ঘটে গেল! এই অনাকাঙ্খিত স্পর্শ সুখে দু’টি হৃদয়ের মাঝে আজ যে সুখের হাওয়া বয়ে যায় তা কিন্তু ছন ভিটায় বসে ছিলো না। আজ তারা অনেকটা পরিণত। সেদিন বর্ণা ছিলো ইন্টারমিডিয়েট আজ পূর্ণ যুবতী। তার রুপ মাধুর্যভরা শরীরখানার অভ্যন্তরে যে সুকোমল হৃদয়খানি আছে, সে হৃদয়ের সবটুকু প্রণাম যার জন্যে নিবেদিত সেই সবুজ আজ ছুঁয়ে দিয়েছে তার স্বপ্ন মানবীর স্তনাগ্র। এ সুখ অপ্রত্যাশিত কিন্তু বর্ণার কাছে তা অনাকাঙ্খিত নয়।
ঘটনার বিহবলতায় দু’জন দু’জনের চোখের দিকে কয়েক মুহুর্ত বিমূঢ় তাকিয়ে থাকে। কেউ যেন কাউকে চিনতে পারছেনা অথবা তারা যেন অন্যলোক হতে এমনি যুগলবন্দী হয়ে ভেসে এসেছে এই পৃথিবীতে। এটা যে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয় তা যেন একেবারেই ভুলে গেছে দু’জন।
ঘটনার আকস্মিকতায় এই নির্জণ পথে দু’টি তরুণ-তরুণীর দেহ-মনে এক নিঃশব্দ শিহরণ বয়ে যায়। ফের দু’জন রিকশায় চাপে। লজ্জায় বাড়ি পর্যন্ত কারও মুখে আর কোন কথা যোগায়না। কিন্তু দু’টি হৃদয়ের গহীন কন্দরে চলতে থাকে বাঁধ ভাঙা জোয়ার, উথাল-পাথাল প্রবাহ।
সেদিনের সেই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে দু’টি মন সীমা অতিক্রম করে উড়ে চলে দিগন্তের ওপাড়ে। তারা একজন অন্যের অন্তর্জগৎ পর্যন্ত স্পর্শ করতে চায়। জানতে চায় তাকে নিয়ে সেও কিছু ভাবছে কীনা।
সবুজ উদ্ভ্রান্তের মতো আচরন করে। চাতালের কাজে মন বসেনা। অকারণে হাসে। কুদ্দুস ইনফরমারের ছেলে চাতালের ম্যানেজার, সে সবুজকে কাছে ডাকে, ধমক দিয়ে বলে-
কীরে সবুইজ্জা, তোর আইজ কাইল কাম কাইজে মন নাই ক্যানরে?
সবুজ কিছু বলেনা।
আজ ফাল্গুনের পহেলা। এই ফাল্গুনকে সবুজের নতুন মনে হয়। কোকিলের কুহুতানকে মনে হয় তার প্রতি বর্ণার সুমিষ্ট সম্মোধন। দখিনা বাতাসে বর্ণার শরীরের গন্ধ ভেসে আসে। সবুজ উত্তেজিত হয়, ঘুমে-জাগরণে ভেসে যায় সবুজ।
ফাল্গুনের সবে শুরু হয়েছে, সবুজ দৌঁড়ে যায় বর্ণাদের বাড়ি। কিছু বলেনা আবার চলে আসে। দু’জনের দেখা হলেও কথা হয়না। রাজ্যের ভয়, রাজ্যের সংকোচ। দ্বিধায় সংকুচিত থাকে দু’জন।
এভাবেই চৈত্র গত হয়ে আসে বৈশাখ, মাঠের গম ক্ষেত শুকিয়ে হরিদ্রাভ রঙ ধরে। সবুজ করম চেয়ারম্যানের চাতাল থেকে মাঠের তপ্ত রদ্দুর মাথায় নিয়ে খালি গায়ে বাড়ি ফিরছে। বাশঁতলায় ছায়ায় বসে একখানা উপন্যাস পড়ছে বর্ণা। তাদের বাড়ির উপর দিয়েই সবুজের যেতে হয়।
উপন্যাস নিয়ে সবুজেরও আগ্রহ আছে। বর্ণার বাবার লাইব্রেরি থেকে সেও মাঝে মধ্যে দু’একখানা বই নিয়ে পড়ে। বর্ণার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সবুজ। কথা বলছে না। কিন্তু হাজারো কথা জমা আছে দু’জনার বুকে। বর্ণার কথারা কবিতা হয়, সবুজের হয় গান। সবুজ সে গান রেওয়াজ করে, সুর দিয়ে বাতাসে ছড়ায়-
গানওয়ালা সবুজ, সুর বান্ধে-
‘আমার মনের মাঝে আগুন জ্বলেরে সখী
তোর শরীরের গন্ধ পাই, গন্ধ পাই
তুই ছাড়া মোর আপন কেহ নাই।
আমি হইলাম পথের কাঙালিনী
সখী আমি হইলাম পথের কাঙালিনী
তবু তোর ভাবনায় কাটে আমার দিবসও যামিনী
তোরে যদি না পাই ভবে
আমার কোন সুখ নাই সখী আমার কোন সুখ নাই
তুই ছাড়া মোর আপন কেহ নাই।।’
সবুজের গানের সুর হাওয়ায় ভাসে। সে সুরে বর্ণার কচি-কোমল হৃদয়খানি ভেসে যায় কিন্তু শান্তি মেলে না।
করম চেয়ারম্যান সবাইকে চাতালে ডেকেছে। রাতে গরু আসবে। সবুজকে বলেন-
ওপাড়ে যেতে হবে সবুজ। মালদহ থেকে গরুর চালান আসবে। সীমান্তের ওপাড়ে গাড়ি খালাস করে গরু খেদিয়ে আনবে। পারবে না?
সবুজ কখনও ওপাড়ে গিয়ে গরু আনেনি। তবু সব দ্বিধা কাটিয়ে বললো- জ্বে, পারবো।
খুশি হন চেয়ারম্যান, বলেন-সাব্বাশ। আরে আমিতো জানতাম। তোর বাপে তো পুরো গরুর পাল একাই আনতো। তুই তো তারই ছাওয়াল।
সবুজের ভালো লাগেনা এসব। তবু সে যাবে। হাত একদম শূন্য, বর্ণাকে কিছু একটা কিনে দিতে মন চায়, টাকাটা তার ভীষণ দরকার।
চাতালে বসে পরিকল্পনা হয়। সবুজরা তিনজন যাবে। রাত দশটার আগেই টহল পার্টি ক্যাম্পে চলে যাবে। গরু আসবে ত্রিশটা। সবুজের ভাগে দশটা, সে পাবে এক হাজার। অর্ধেক দিতে হবে করম চেয়ারম্যানকে। পাঁচশো থাকবে তার। এ মাসে আর কোন চালান আসেনি, রোজি-রোজগারও হয়নি
সবুজের বাবা অনেকটা অসুস্থ তার উপর বয়স হয়েছে। আগের মতো কাজ-কর্ম পারেনা। ইদানীং সবুজের কাছে হাত পাতে মেনাজ মণ্ডল।
মালদাহ থেকে গরুর চালান এসেছে। দু’টি ট্রাকে ত্রিশটি গরু। সবগুলো গরুই হরিয়ানা প্রদেশের বিশাল বিশাল গরু। শিংগুলো মহিষের মতো বাঁকানো। খানপুর সীমান্ত ফাঁড়ির তিন কিলোমিটার পশ্চিমে করম চেয়ারম্যানের আম বাগান।এই আম বাগানের ভেতর দিয়ে খেদিয়ে আনতে হবে গরুগুলো। ইনফরমার কুদ্দুসের সাথে ফাঁড়ির লোকজনের কনট্যাক্ট হয়ে গেছে। ফাঁড়ি থেকে সময় বেঁধে দিয়েছে-রাত এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।
সরকার নির্ধারিত ট্রানজিট দিয়ে আনতে গেলে গরুর বাজার মূল্যের তিরিশ পারসেন্ট টাকা ট্যাক্স দিতে হয় আর চোরাই পথে আনলে পনেরো পারসেন্ট খরচ। এই পনেরো পারসেন্টের অর্ধেক ওপাড়ের এবং এপাড়ের ফাঁড়িতে দিতে হবে। বাকী অর্ধেক স্মাগলারদের মধ্যে বন্টন।
বিবর্ণ পাণ্ডুলিপি (পর্ব-০৭) | আনোয়ার হোসেন বাদল
Leave a Comment



