২১ শে ফেব্রুয়ারি আমাদের রেলি আইসা শেষ হইলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। আমরা সবাই বিশ্রাম নেয়ার লাইগা ঘাসের উপর বসছিলাম। হঠাৎ দেখলাম কিছু পোলাপাইন খুব জোরে চিৎকার করতে করতে দৌড়াইতাছে। কিছু বুইঝা ওঠার আগেই দেখলাম চারপাশে ধোঁয়া আর ধোঁয়া। এর মধ্যে বুঝবার পারলাম আমার চোখ ভীষণভাবে জ্বলতাছে। শরীর অবস হইয়া আসতে ছিল। বুঝবার বাকি রইলো না আমাদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হইছে। কোন মতে জান বাঁচানোর লইগা আমরা সবাই জগন্নাথ হলের দিকে দৌড় লাগাই। কিছুতেই যেন সামনের দিকে পা আগায় না। হাঁটা বা দৌড় দেয়ার মতো শক্তি দেহে অবশিষ্ট ছিল না। আসাদ আমার হাতটা ধইরা পুকুরে ঝাপ দিল। এর মধ্যে মিলিটারি আইসা আমাদের সবাইকে হাত ধইরা টাইনা জীপে তোলা শুরু করছে। আমারে যখন হাত ধইরা নিতেছিল দেখলাম রাস্তায় অনেক লাস পইরা আছে। গ্যাসের ঝাঁঝের কারণে ভালো কইরা চোখ মেইলা দেখতে পারছিলাম না ঐ শকুনের বাচ্চারা আমার কোন কোন ভাইদের তাজা প্রাণ কাইরা নিছে।
জীপে ওঠার পর সবাইরে দেখতেছিলাম। আসাদ, হাশেম আরো অনেক বন্ধু, বড় ভাইদেরকেও দেখলাম কিন্তু শরীফকে দেখবার পাইলাম না। মনে মধ্যে একটা অজানা ভয় উঁকি দিল। ভয়ে ভয়ে হাশেমরে জিগাইলাম শরীফরে দেখছে কিনা। হাশেম কইলো দৌড় দেওয়ার সময় দেখছিলাম হের পর তো আর খেয়াল নাই। আছে হয়তো অন্য গাড়িতে। হাশেমের কথা হুইনা একটু সস্তি পাইলাম।
সেখানে বইসাই শুনলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বরকতের নাকি গুলি করে মাথার অর্ধেক উরাই দিছে। এছাড়াও সালাম, রফিক জব্বার আরো অনেকে শহীদ হয়েছে। আমার শরীফের জন্য অনেক চিন্তা হচ্ছিল। টানা দুইদিন পর আমাদের ছেড়ে দেয়া হইলো। হলে ফিরা আমার এক শরীফের খোঁজ নিতে গিয়া আমার এক সহপাঠী বন্ধু বলল ঐদিন নাকি আমার শরীফো শহীদ হাইছে। হানাদারদের গুলি ওর হৃদপিন্ড ভেদ করে গেছে। সেদিন ওরা অন্য ছাত্রদের লাশের সাথে শরীফের লাশও পেয়েছিল। তারপর সবার সাথে ওকে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। শরীফের কথা শুনে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। আসাদ আর হাশেম আমাকে রুমে নিয়ে যায়। পরেরদিন সকালে আমরা সবাই শরীফের কবর জিয়ারত করতে গেলাম। বাংলাকে আমরা মাতৃভাষা রূপে পেয়েছি ঠিকই কিন্তু তার জন্য জীবন দিতে হয়েছে হাজার সালাম, রফিক জব্বার, বরকত আর শরীফের মতো অনেককেই। তাদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা প্রিয় মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার পেয়েছি। বাঙালি জাতি কোন তাদের অবদান ভুলবে না। এসকল শহিদের স্মরণে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিকে ভাষা শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই দিন খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। রক্তিম কৃষ্ণচূড়াও যেন আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
রক্তে রাঙানো একুশ | মায়েদা জাহান মৌ
নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিলেই জীবন সুন্দর।
1 Comment




চমৎকার