দশ বছর আগের ঘটনা… যখন এইচএসসি পাশ করিবার পর কোন এক সন্ধ্যায় আমার কিছু বড়লোক বন্ধু জুটিলো। তাহাদের সাথে দিনরাত আড্ডা দিতে লাগিলাম। তারা সবাই আমার সমবয়সী এবং আমার চাইতে কিঞ্চিৎ আনস্মার্ট।
কিন্তু সেই আনস্মার্টনেস অল্প দিনের রংগ মাত্র। কিছুদিনের মাথায় তাহারা গুলশান বনানীর বড় বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইলো এবং আপাদমস্তক বদলে গেলো।
তারা তখন পলওয়েল মার্কেটের দামী জিন্স জুতা টিশার্ট পরিধান করে। ব্ল্যাক বেরি আইফোন সনি সাইবার শট নোকিয়া এন সিরিজ মোবাইল ইউস করে। তাহাদের মানিব্যাগে মানিব্যাগে তখন ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড। এত এত গার্লফ্রেন্ড, গার্ল-ফ্রেন্ড উইথ বেনিফিট।
চোখের পলকে আমি তখন নিজেকে তাদের মাঝে চরম ক্ষ্যাত আবিষ্কার করিলাম। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি আর নিজের হাতখরচ যোগাতে টিউশনি করতে করতে আমার তখন ত্রাহি অবস্থা।
অথচ তারা তাদের ক্লাসেই ঢুকেনা। ক্লাসে ঢুকিবে কি তাহারা টিউশন ফি’ই জমা দেয়না। বরং টিউশন ফি’র টাকা দিয়া তাহারা বড় বড় বাইক কিনিলো। পিতা মাতার গাড়িকে মোডিফাই করিয়া রেসিং কারে বদলাইয়া ফেললো। লাখ টাকা খরচ করিয়া ইন্সট্রুমেন্ট কিনিয়া ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ ব্যান্ড দল বানাইলো।
আমি তখন ফুটপাতে মুড়ি খাই আর তারা কথায় কথায় কক্সবাজার যায়। সারারাত এসি গাড়িতে লং ড্রাইভ করে। বিভিন্ন ডিজে পার্টি যায়। ফ্যাশন শোতে যায়। একদা তারা আমাকেও একটা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড শো’র একটা পার্টিতে নিয়ে গিয়েছিলো। অনেক রুপসী নারীর সাথে পরিচয় করাইয়া দিয়েছিলো। আহা! কি সুন্দরী অপরুপ নারী সবগুলা। সবাই এংলো ইন্ডিয়ান একসেন্টে বাংলা কথা বলে। কেউ কেউ সাদা রংগের লাইট সিগারেট টানে। মনে আছে সেদিন আমার ছানাভরা মুখ দেখে পাশের এক ছেলে সান্তনা দিয়া বলেছিলো, এখানকার মেয়েদের দেখে তুমি তাদের ভিনগ্রহের পরী ভাবিওনা। তারা বেশিভাগই কিঞ্চিত উচ্চবিত্ত পরিবারের একেবারেই ‘সাধারন’ মেয়ে ‘ছিলো’।কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তি হইয়া তারা প্রথমে ডেন্টিস্টের কাছে যায়, অতঃপর মুখে গুনা লাগাইয়া দাঁত সোজা করিয়া ফেলে। তারপর বিউটি পার্লারে যায়, চুল স্ট্রেইট করিয়া ফেলে। অতঃপর ফেসিয়াল করিয়া, ভাষার এক্সেন্ট বদলাইয়া নিজের আপাদমস্তক বদলাইয়া ফেলে, আর বয়ফ্রেন্ডের টাকায় বড়লোকি করিয়া ‘লাইফস্টাইল’ চেঞ্জ করিয়া ফেলে। তারা দুর্লভ না, সহজলভ্য। মাসে দশ পনেরো হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য থাকিলে তুমিও এমন একটা গার্লফ্রেন্ড পালিতে পারিবে। বাসা থেকে এই টাকা যোগাতে পারলেই হইলো!
আমি বিষম খাইয়া চলিয়া আসিয়া ঘন্টাখানিক ভাবিয়া ঐসকল ফ্রেন্ডদেরকেই ছাড়িয়া দিলাম। পাড়ার সমপর্যায়ের দোস্তদের কাছে ফেরত গেলাম।
অতঃপর পারিবারিক মূল্যবোধ মানিয়া লইয়া পড়াশোনায় আরো মনযোগী হইলাম এবং ক্যান্টিনের পাঁচ টাকার সিংগাড়া আর পকেটের নকিয়া ১১০০ তেই নিজের সুখ খুজিয়া লইলাম।
সন্ধ্যায় পাড়ার টং দোকানে তখন সাত টাকার চা দুই কাপে, আর একটা লাল গোল্ডলিফ তিনজনে টেনে স্বর্গসুখ খুজে পাই। আর কখনো পড়াশুনা মিস করিনা, কোন এক্সামও মিস করিনা, আবার টিউশনিও মিস করিনা। মধ্যবিত্তের সন্তান তাই বাবার টাকায় চলার ‘পাপী’ চিন্তা ভুলেও মনে স্থান দেই না।
এভাবে চার-পাঁচ বছর গেলো। হাতে সার্টফিকেট পাইলাম। মুক্ত জীবনের স্বাদ নিলাম।
কিন্তু আমার সেই বড়লোক বন্ধুরা? তারাতো চার বছরে প্রথম সেমিস্টারই পার করতে পারেনি। পাশ করিবে কি? অথচ বাসা হইতে নিয়মিত লাখ লাখ টিউশন ফি লইয়াছে আর উড়াইয়াছে ঠিকি।
জীবনের ফেরে তারা এখন পাংশুমুখ করে আছে। ভবিষ্যত আর কি, বর্তমান লইয়াই তারা তখন হতভম্ব। আমি তখন পুনরায় তাদের সাথে মিশিলাম আর সান্তনা দিতে লাগিলাম।
কিন্তু তাহারা আপসেট থাকিলো সর্বোচ্চ পনেরো দিন কি এক মাস। তারপর আবার সব চেঞ্জড।
হঠাৎ একদিন দেখি তাদের সবার হাতে সার্টফিকেট। তাহারা বিতর্কিত ও নিম্নমানের কিছু ভার্সিটি থেকে নগদ মূল্যে বিবিএ সার্টিফিকেট খরিদ করিয়া ফেলিয়াছে। সেই সার্টফিকেটে তাহাদের রেজাল্ট আবার ৩.৮৫! ৩.৮৭!! এসব দেখিয়া আমি পুনরায় ভীড়মি খাইলাম!
দৃশ্যপট আবার বদলাইয়া গেলো। আমি ‘অরিজিনাল’ভাবে পাশ করিয়া পুরাই বেকার। আর তাহারা ‘নকল/নিম্নমানের’ সার্টিফিকেট দিয়াই মামা চাচার জোরে বড় বড় বায়িং হাউস/ ইমপোর্ট এক্সপোর্ট কোম্পানীতে মোটা বেতনের চাকুরীদার। কেউ কেউ বাবার ব্যাবসার হাল ধরিয়া মাসে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকার মুনাফাও গুনিতে লাগিলো। রেমন্ডের প্যান্টের সাথে আর্টিস্টির শার্ট আর আয়নার চেয়ে চকচকে ভেন্টুরিনি জুতা পরিয়া তাহারা অফিস যায়, আর আমি বেকার মানুষ ফুটপাতের ক্যাংগারু চপ্পলের মলিন তলায় কাদায় আছাড় খাই।
আজ আমি চাকুরী খুজি, আর তাহারা চাকুরী দেয়। আমি মেধা বেঁচে জীবন কাটাই, আর তাহারা মেধাবীদের নিয়া হাসাহাসি করে।
তাদের দেখিলে আমার মাঝে মাঝে স্কুলের একটা ঘটনার কথা মনে পরতো। একবার ইংলিশ ক্লাসে পড়া না পাড়ায় স্যার দুইজন ছাত্রকে দাড় করিয়েছিলেন। একজন মাস্তান টাইপের বড়লোক ছেলে, আরেকজন রেলওয়ে কলোনীর গরীব কেরানীর ছেলে। সেদিন স্যার বেত হাতে দুইজনের সামনে আসলেন এবং কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই গরীব ছাত্রটিকে মারতে লাগলেন।
মারা শেষ হলে হাঁপাতে হাঁপাতে গরীব ছাত্রটিকে বলিলেন, “তোর পাশের ছেলে পড়া না পারলে অসুবিধে নেই। সে মাস্তানীর জোরে বাপের সম্পদের জোরে সারাজীবন রুটিরুজি জোগার করে নিবে। তুই না পারস মাস্তানী না তোর বাপ বড়লোক। তাহলে পড়া পারিস না কেন হারামজাদা!”
হ্যা, আজ আমি বুঝি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার মুল্য কত। কেন তাদের বুয়েট মেডিক্যালে চান্স না পেলে জীবন থেমে যায়।
‘সাধারন(?)’ সার্টিফিকেটে এদেশে চাকরী জোগানোও কঠিন হয়ে যায়। মামা চাচার খুটির জোর নেই, তাই ইন্টারভিউয়ের আগেই চাকরী হয়ে যায়না … কৃষকের সন্তানও জমি বেচে মধ্যপ্রাচ্যে যেয়ে গতর খাটানি দেয়, আমাদের বাবার কাছে প্লেনের টিকেট কেনার টাকা থাকেনা … সিএনজি ওয়ালা রিকশাওয়ালাও মাসে পনেরো বিশ হাজার টাকা কামায় … আমাদের সেই উপায়ও নেই। আমাদের একটাই উপায়, পড়াশোনা। তাও ‘উচ্চতর’মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হতে হবে, নইলে ভবিষ্যতে স্বাচ্ছন্দে বাঁচার সুযোগ থাকেনা।
পাশ করে আমার মতো সাধারন ক্লাসমেটরা সেলস/মার্কেটিংয়ে উদয়ান্ত চাকরী করে, প্রতিদিন আটদশবার বসের ‘বকা’ খেয়ে, আট দশ হাজার টাকা মাইনে পায় এখন। আর আমি সেপথ ছেড়ে সারাদিন টিউশনি করে সারারাত বিসিএসের জন্য পড়ছি এখন। এছাড়া আমার আর কোন গতি নেই। নইলে আমাকেও বাবার মতো আজীবন কেরানী হয়ে থাকতে হবে। হাজার শেকলে আমৃত্যু বাধা থাকতে হবে। আমি সেটা চাইনা।
সারাদিন টিউশনি করে রাতে যখন ভাত খেয়ে বিসিএসের গাইড বই হাতে নেই, আমার সারা গায়ে তখন স্কুলের সেইদিনের বেতের বাড়িগুলোর ব্যাথা অনুভব হয়।
আমার শিরদাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত ভেসে নামে। আমি সমুদ্রের মাঝে শেওলা আকড়ে ভেসে থাকি, শুধু ভেসে থাকি। মান সম্মান নিয়ে বাঁচার নিয়ন্ত লড়াই করি।
আমি গড়গড় করে বিসিএস গাইড মুখস্ত করতে থাকি। চোখে পানি নিয়ে আমি বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা উপধারা মুখস্ত করি, মুখস্ত করতে থাকি লাল নীল দিপাবলী।
কারন দিনরাত আমার মনে হয় কানের কাছে সারা পৃথিবী চিৎকার করে বলছে, “তুই না পারস মাস্তানী, না তোর বাপ বড়লোক। তাহলে পড়া পারিস না কেন হারামজাদা! পড়া পারিস না কেন হারামজাদা!! পড়া পারিস না কেন হারামজাদা!!!”



