আনন্দ, উচ্ছ্বাস, জীবনের উজ্জ্বল রঙিন অধ্যায়, সাফল্যের ভেলায় ভেসে যাওয়ার উদ্দাম সময় কিংবা বেদনা, শোকাবহ বিরহকাতর মুহূর্ত, দুঃখময়, ব্যর্থতার গ্লানিভরা নিকষ কালো আঁধার সময়ে একজনের সাহচর্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় মনে হয় যে কারও কাছে। সে হলো বন্ধু। সময়ের ঘড়ি পৃথিবীর বুকে যতই রেখা এঁকে চলুক, বন্ধুত্বের বাঁধন কিন্তু তার দৃঢ়তা হারায়না। সব বাধা বিপত্তিকে ছাপিয়ে এই বন্ধুত্ব এগিয়ে গেছে। এই বন্ধুত্বের আছে নানা বর্ণ, নানারূপ। এ এক অদ্ভুত সম্পর্ক, যেখানে সম্পর্ক ছাড়াই আছে স্বার্থরক্ষার তাগিদ। আর তাই বন্ধুত্বের সংজ্ঞা দেয়াটাও বেশ জটিল কাজ। ঝড় তোলা চায়ের টেবিলে, জমজমাট আড্ডায়, প্রভাত ফেরির দীপ্ত পদযাত্রায় অথবা পালিয়ে বিয়ে করা কিংবা চরম বিপদের মুহূর্তে সঙ্কটে সমস্যায় সব সময়ে যে মানুষটি আপনার কাছে সবচেয়ে আপন তিনি হচ্ছেন বন্ধু।
জ্যোৎস্নার আলোক উদ্ভাসিত প্রকৃতি ভাণ্ডারে কিংবা অমাবস্যায় যেখানেই তার অবস্থান হোক না কেন মানুষ একজন বন্ধুকে খোঁজে। বন্ধুত্বের প্রতি মানুষের এ আকুতি চিরন্তন। সৃষ্টির ক্রমবিকাশে বন্ধুত্বের রূপ বদলে গেছে, লিঙ্গ লিঙ্গান্তর ভেদ উঠে গেছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন খসে গেছে, যান্ত্রিক সভ্যতার আবেশ লেগেছে। তারপরও বন্ধুর খোঁজে মানুষের বিচরণ কমেনি এতটুকুÑএ কথা আজ নিশ্চিত করে বলা যায়, বন্ধুহীন লোক সমাজে অসহায়। ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে চায় তেমনি করে অসহায় বন্ধুহীন মানুষও নিজের মনের ভেতর বন্ধুত্বের সন্ধান করে। সার্বিক বিবেচনায় এ এক সরল সত্য যে, বন্ধুত্বের ছোঁয়া ছাড়া কোন মানুষ পরিপূর্ণ রূপ পেতে পারে না। সামাজিক পরিচয়ের গ-িতে হয়তো কেউ মা কেউবা বাবা আর কারও কারও পরিচয় ভাই, বোন কিংবা স্ত্রী হিসেবে। এসব পরিচয়ের অন্তরালে প্রতিটি মানুষই কিন্তু পরস্পরের বন্ধু। তাই বন্ধুত্বের কোন বয়স নেই, দেশ নেই, কাল বা পাত্রভেদ নেই। মনের কাছাকাছি অবস্থান সূচনা ঘটায় বন্ধুত্বের। অন্য সব সম্পর্কের মতোই এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি মানবিক স্পর্শজাতক। সত্য ও সুন্দর এই যে, মানুষ বন্ধু পেতে চায় কিংবা বন্ধু হতে চায় নির্ভরতার তাগিদেÑযা তাকে প্রতিনিয়ত অবলম্বনের শ্রেষ্ঠ আধার উপহার দেয়। মানুষের জীবনের পবিত্র সম্পর্কের একটি হচ্ছে বন্ধু। বন্ধুত্বে আবির্ভাবটা হবে অনেকটা নিঃশব্দে। এ জায়গাটাতে অবশ্যই বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় ফিরে যাওয়া যায়। একটা শান্তিপ্রিয় মানুষ, যার কথা আপনাকে মুগ্ধ করে। যে কাজকর্মে বেশ পটু, আপনার বিপদে পাশে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে চায়, যুক্তি দিয়ে আপনার ভুল ভাঙ্গায় আর যাকে আপনি একটু আধটু বিশ্বাস করেন সেই তো আপনার প্রকৃত বন্ধু।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই বন্ধুত্বের প্রভাব যথেষ্ট। আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না সবকিছুতেই বন্ধুর ছোঁয়া না থাকলে পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন পানসে হয়ে ওঠে। আমরা সবাই হয়তো প্রিয় বন্ধুটির ওপর খানিকটা অধিকার খাটাতে চাই। সত্যিকার বন্ধুর ওপর তো কিছুটা অধিকার খাটানো যেতে পারে। তবে তার আগে পরিমাপ করে নিন, আপনার বন্ধুটি এই কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে কতটা খোলা মন। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। কিন্তু সে মুহূর্তে হয়তো বাড়িতে আপনার স্ত্রী বা স্বামী আপনাকে মিস করছে। সে হয়তো এ সময়টাতে আপনার সঙ্গ কামনা করছে। সে ক্ষেত্রে আপনাকে বুঝতে হবে, আর আপনার বন্ধু-বান্ধবীকে বোঝাতে হবে। সবকিছুর ওপর যে কথা, বন্ধু নির্বাচনে দেখে নিন তার মানসিকতা আর বাস্তব জীবন আপনার সঙ্গে কতটা মিলে।
বন্ধুত্ব করতে গেলে শেয়ারিংটা জরুরী। নিজেকে লুকিয়ে রাখলে কখনই বন্ধুত্ব হবে না। নিজের চিন্তাভাবনাকে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করুন। পাশাপাশি অন্যের কথাগুলোও মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
শত্রু নষ্ট করার মূল কৌশল হলো তাকে বন্ধু বানিয়ে ফেলা। ইদানীং ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’ বিষয়টি নিয়ে বেশ মাতামাতি হচ্ছে। বন্ধুর সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট এবং আঙ্গিক ভেদে বন্ধুত্বের উপস্থাপনও ঘটে ভিন্নরূপে। বিশ্বজুড়ে হানাহানি আর মতপার্থক্যের যে আধিক্যতা তা কমাতেই বোধকরি মানবীয় আবেগ অনুভূতিকে নিয়মিত আন্দোলিত আলোড়িত করার জন্য এ ধরনের বিশেষ দিবস প্রচলনের প্রয়াস।



