ছেলেদের জাতটাই একটু কেমন জানি হয়।
এরা সমস্যাগুলো খুব সহজে বলে না। সারাবেলা না খেয়েও, রাতে অনায়াসে ভাব নিবে সব ঠিক আছে। হাতে একটা পয়সাও থাকবেনা তাও চাইবেনা। বুঝতে দিবেনা তার বিপদ যাচ্ছে। সারাদিন বাসের দরজায় কিংবা ভিতরে ধাক্কায় আর টেম্পুর পিছে চড়ে বাসায় আসলেও, আজকে বাইরে ঠিক কতটা গরম ছিলো তা তাদের মুখ দেখে বুঝলেও মুখ ফুটে বলতে খুব কম শুনবেন।
একটা চাকরি মাস্ট করা লাগবে, চাকরি নাহোক ব্যবসা তো করতেই হবে। কারন বসে বসে খাওয়াতে বাবা মায়েরও গায়ে লাগবে, পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করা তো দুরের কথা। টাকা ইনকাম তো করাই লাগবে, নাহয় বউকে বাচ্চা নিয়ে চলবে কি করে?
মানলাম ছেলেরা ছোটবেলা থেকে বেশ আহ্লাদী হয়। তাদের সব কাজ হয় তাদের মায়েরা করেন নাহয় ওই সে এক ছোট বোন বা ভাই, যার উপর যত অত্যাচার। কিন্তু এই আহ্লাদটাও একটা বয়স পর্যন্ত। এরপর ছেলেদের আর আহ্লাদ হয় না, বরং তার কাছে বাবা মায়ের আবদার থাকে । সে আবদার তাকে অবশ্যই রাখতে হয়। দায়িত্বে পড়ে যে!
অমুক বাড়িতে ছেলে হইসে , বংশের প্রদীপ আসছে।
বংশ আলোকিত করতে গিয়ে নিজে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার গল্প সব ছেলের কাছে খুব একটা অপরিচিত না।
সোসাইটির অদ্ভুত মাইন্ডসেট, ছেলেরা কাঁদতে পারবেনা। এতে নাকি দুর্বলতা। অথচ সাইকোলজি বলে যে কাঁদেনা সে দুর্বল। ছোটবেলা থেকে বেলায় অবেলায় একটা ফোবিয়া ঢুকিয়েই দেওয়া যে, ” কাঁদলেন তো হেরে গেলেন। ” কান্না বাদ দেন, এই ফোবিয়ার প্রভাব এতোটাই তীব্র যে এরা এদের সমস্যাগুলো মুখেসহ আনতে পারেনা।
আসলেই ছেলেদের জাতটা একটু আলাদা। এদের এক ভাগ বিশ্বাস ভাঙে আর এক ভাগ সারাটা জীবন বিশ্বাসটা রাখে। গুটিকয়েক ছেলের সাথে কয়েকটা খারাপ অভিজ্ঞতায় যখন কতগুলো মেয়ে বায়োতে বা স্ট্যাটাসে , ” অল ম্যান আর ডগ, কিপ আ ডিসট্যান্স ” লিখে রাখেন, নিজের বাবার সাথে একটু বাজারে গিয়ে দেখিয়েন ভাই, মানুষটা নিজের জন্য পছন্দের সবজিটা সহ কিনেন না।
মেয়ের জাত মায়ের জাত হলে, ছেলের জাতও বাবার জাত। একজন আগলে রাখেন, আর একজন সামলে রাখেন।
ছেলেরা কাদেঁনা?? কাদেঁ। সাইকোলজি বলে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা পেইনগুলো আরও ইনটেন্সলি ফিল করে। শুধু হাউমাউ করে সবাইকে দেখাতে পারেনা হয়তো।
মায়া হয়, বড় মায়া হয়, যখন একটা সিচুয়েশনে নিজেকে রেখে ভাবি যে, ” ভরা মজলিশে মেজাজ খুব গরম, রাগে হাত পা কাঁপছে, কিন্তু এইসব থেকে বড় সত্য আমি অসহায়, আমার ভয় হচ্ছে, একটা কাধ পেলে স্বস্তি হতো, অথচ আশেপাশে তাকিয়ে দেখি কেও নাই। আমি সহ্য করতে পারিনা, অথচ কাঁদতে পারবোনা কারন আমি ছেলে। ” এইখানে আমার মায়া হয়। যদি কেও বলে যে পৃথিবীর কোনো ছেলে এই সিচুয়েশনে পড়েনাই তাহলে সেটা মিথ্যা। রাস্তায় বের হওয়া প্রতিটা মেয়ে যেভাবে জীবনে একবার হলেও হ্যারেসমেন্ট বা ইভটিজিং এর স্বীকার হইসে ঠিক তেমনটা এই সিচুয়েশনে প্রতিটা ছেলে একবার না একবার পড়সে।
একটা মেয়েকে বডি শেমিং করলে আপনি ছোটোলোক, কিন্তু ভাই ছেলেদের কি বডি শেমিং হয় না?? নাকি বন্ধুদের আড্ডায় কয়েকটা কটুক্তি সবসময়ই গ্রহণযোগ্য থাকে??
শরীরের স্থুলতা বা গায়ের রঙ হতে শুরু করে দাড়ি উঠা নিয়েও খোঁচাখুঁচি চলে। অথচ বেশিরভাগ ছেলের হয়তো গায়ে লাগানোর ব্যাপারটাও মাথায় আসেনা। কি করবে ছোটোবেলা থেকে গায়ের চামড়া শক্ত হতে হতে বড় হইসে। একটা সময় আর কিছু গায়ে লাগেনা।
হ্যারেসমেন্ট! ইন্ডিয়াতে গড়ে ষোলজন পুরুষ হ্যারেসমেন্টের স্বীকার হয়, এই জিনিস আমি জানসিলাম আজ থেকে ছয়বছর বা পাঁচবছর আগে। সংখ্যাটা এতোদিনে আরও বাড়বে, কমবেনা।
ছেলেদের জাতটা আসলেই একটু আলাদা। তাই হয়তো আমরা বাড়িতে মাকে চিৎকার করে কাঁদতে দেখলেও বাবাকে কখনো ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে বসে চোখ মুছতে দেখিনা।
মন খারাপ থাকলে সূক্ষ থেকে সূক্ষ জিনিস এদের কানে তুলে দিলেও এদের মুখ দিয়ে খুব সহজে কিছু বের হয় না। বের হবেও না হয়তো। আর এই জায়গায় আমার তাদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সম্মান দেখানো।
আমি আমার বাবাকে দেখতাম খুব রাগ হলে ওইপাশে ফিরে কাওকে কিছু না বলে মুখভার করতেন আর বসে থাকতেন, খুব বেশি হলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতেন। যত যত বড় হচ্ছি দিন দিন টের পাচ্ছি, আমি উনার মতোই। আমিও মুখভার করে রাখি, কিন্তু আমি হয়তো উনার মতো এতোটা অসহায় না। আমি কাঁদতে পারি, ঘর থেকে রাতবিরাতে বের হওয়ার স্বাধীনতা না থাকলেও নিয়তি কান্নার মতো এই ঠুনকো আবেগ প্রকাশের স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছে। আর যাদের এই স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি তাদের জন্য সম্মানটাই রইলো। আর আজীবন থাকবে।



